শিরোনাম:
ফরিদগঞ্জে কুকুরের কামড়ে আহত ২০ কচুয়ায় মাদক মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামী গ্রেপ্তার মেঘনায় কার্গোর ধাক্কায় তলা ফেটেছে সুন্দরবন -১৬ লঞ্চের, নারী নিখোঁজ ষোলঘর আদর্শ উবি’র ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি অ্যাডঃ হুমায়ূন কবির সুমন কচুয়ায় নবযোগদানকৃত প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারকে শিক্ষক সমিতি শুভেচ্ছা মতলব উত্তরে লেপ-তোশক তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছে কারিগররা উপাদী উত্তর ইউনিয়নে দীপু চৌধুরীর স্মরণে মিলাদ ও দোয়া পশ্চিম সকদী ডিবি উচ্চ বিদ্যালয়ে নবগঠিত কমিটির দায়িত্ব গ্রহন মেঘনা নদীতে গোসল করতে গিয়ে তলিয়ে গেছে এক যুবক ফরিদগঞ্জের ঘনিয়া দরবার শরীফের পীরের সঙ্গে ড. মোহাম্মদ শামছুল হক ভুঁইয়ার সাক্ষাৎ

পতিতা পাড়া আছে খদ্দের পাড়া নাই !

reporter / ২৮৯ ভিউ
আপডেট : রবিবার, ৯ জুলাই, ২০২৩

মাহবুব আলম প্রিয়ঃ
মানুষ সামাজিক জীব। স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি।  সকল ধর্ম বর্ণ শ্রেণি বৈষম্যের ভেরাজাল ভেঙ্গে একটি সুশৃঙ্খল প্রাণী মানুষ। তথাপিও ভুল আর অপরাধ আমাদের গিলে খায় প্রতিনিয়ত।  আমরা ভুল করি। বারবার করি। করতেই থাকি। সংশোধন করার ইচ্ছে থাকে কিন্তু বাস্তবায়নে বড্ড অলস।  কথার পিষ্ঠে কথা থাকে। দেশের সংবিধান আর আইনের পরিপন্থী কাজকে বলা হয় স্ব স্ব দেশের অপরাধ।  আবার ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অপরাধের সঙ্গা ভিন্নরকম। সমাজবিজ্ঞানীদের কাছে অপরাধের সঙ্গাও ভিন্ন রকম। স্থান কাল পাত্রভেদে অপরাধের ধরন ও চালচলন একেক রকম। কোন সমাজে যেটা অপরাধ অপর সমাজে সেটা হতে পারে ভালোকাজ। এটার তফাৎ সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ধর্মীয় কাজে। ইসলাম ধর্মে গরু কুরবানি বা জবাই করে এর গোস্ত থেকে আমিষ সংগ্রহ করা সওয়াবের কাজ। অন্যদিকে সনাতন ধর্মালম্বীদের কাছে এটা গর্হিত কাজ। ইসলাম ধর্মে মাদক নিষিদ্ধ কিন্তু অন্য বেশ কিছু ধর্মে সেবন বৈধ। এভাবে ধর্ম ভেদে অপরাধ ভিন্নরূপে ঘটে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে বৈধ জীবিকা নির্বাহের পন্থার একটি হলো পতিতা বৃত্তি। যারা এ কাজে জড়িত থাকে তাদের বলা হয় পতিতা আর তাদের কাছে যেয়ে সাময়িকভাবে চুক্তিভিত্তিক যারা শারীরিক চাহিদা মেটায় তাদের বলা হয় খদ্দের।  যা দেশের আইন ও সংবিধান সম্মত বটে। কিন্তু ধর্মীয় বিধি তা বৈধতা দেয় না। যেহেতু এটাও মানবসৃষ্ট আইনে বা দেশীয় সংবিধানে বৈধতা পায় সেহেতু তাদের একটা গন্ডি করে দেয়া হয়। পল্লি বা পাড়া নামে তাদের আলাদা স্থানে বসবাসের সুযোগ দেয়া হয়। তবে নানাকারনে পতিতা বৃত্তি সমাজে নীতি নৈতিকতার প্রশ্নে এক নিন্দনীয় কাজ ধরা হয়। এতে যারা পতিতাবৃত্তি করে তাদের সমাজ নানাভাবে হেয় করে দেখে। তাদের সমাজের কোন প্রকার গ্রহণযোগ্যতা নেই বললেই চলে। অথচ যারা এ সমাজে গ্রহণ যোগ্যতা দেয় না তাদের একটা অংশ ওই পতিতাদের পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকে। তাদের একটা অংশ গোঁপনে খদ্দের হয়ে থাকেন। আলোচ্য বিষয়ে বলাবাহুল্য দেশের চিহ্নিত পতিতা পল্লি আছে। কিন্তু খদ্দের পল্লি নাই। কারন খদ্দেররা কখনো প্রকাশ্যে ওইসব পাড়ায় যাতায়াত করে না।
কারন, পতিতাদের দেখা হয় জঘন্য পাপরানী হিসেবে আর খদ্দেররা থাকে সমালোচনার বাইরে তথা লোক চক্ষুর আড়ালে৷ এ বিষয়ে সমাজভাবনা ও বাস্তবতা এখানে নিষ্ঠুর। পতিতার যৌবনে খদ্দেরের কাছে চাহিদা থাকলে বৃদ্ধ বা অসুস্থ হলে তাদের পাপী করে রাখা হয়। তাদের সমাজের কোন পোস্ট পদবী ছুঁয় না। তারা একটি কবরস্থানের নিশ্চয়তা পায়না। সাধারনদের গোরস্থানে হয়না তাদের মরদেহ সৎকারের স্থান।  অথচ হতে পারে সংশ্লিষ্ট গোরস্থানে ওই পতিতাদের খদ্দেররা সসম্মানে চিরনিদ্রায়  শুয়ে আছেন। তবে মহান মালিকের কাছে সব কিছুই স্পষ্ট।  প্রশ্ন হলো, সমাজের নানা অপরাধে জড়িতরাও একই গোরস্থানে মারা গেলে জায়গা পায়৷ কিন্তু পতিতা পায় না। তাদের মরদেহ ভাসিয়ে দেয়া,পূঁতে ফেলা, পুড়িয়ে ফেলা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়,
বাংলাদেশে পেশাদার যৌনকর্ম (পতিতাবৃত্তি) আইন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হলেও বৈধ। আইন অনুসারে কেবল প্রাপ্তবয়স্ক নারীরা আদালতে ঘোষণা দিয়ে পেশাদার যৌনকর্মে নিয়োজিত হতে পারেন, যদিও বাংলাদেশে লক্ষাধিক যৌনকর্মীর মধ্যে বিপুল সংখ্যক শিশুও রয়েছে। বাংলাদেশে সাধারণত তিন ধরনের যৌনকর্মী দেখা যায়: হোটেল ভিত্তিক, পার্ক ও উদ্যানে ভাসমান এবং যৌনপল্লিভিত্তিক। বিশ ও একুশ শতকে বেশ কিছু যৌনপল্লি উচ্ছেদ করা হলেও ২০২০ সালে বাংলাদেশে ১৪টি নিবন্ধিত যৌনপল্লি ছিলো। পেশাদার নারী যৌনকর্ম বৈধ হলেও পেশাদার পুরুষ যৌনকর্ম অবৈধ, যদিও বিভিন্নস্থানে তার প্রচলন রয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী বাংলাদেশে ২ লক্ষ যৌন কর্মী আছে যাদের মধ্যে ১০ থেকে ২৯ হাজার অপ্রাপ্তবয়স্ক।
যৌনকর্মীদের আভিধানিকভাবে দেহপসারিণী, নগরবধূ, বেশ্যা, রক্ষিতা, খানকি, জারিণী, পুংশ্চলী, অতীত্বরী, গণিকা, কুলটা, বারণবণিতা, কুম্ভদাসী, নটি, রূপজীবা ইত্যাদি নামেও ডাকা হয়। অভিধান মতে তাদের খানকি,ছিনাল, ছেনাল, গণিকা, গণেরুকা, দেহোপজীবিনী, নটী, নটিনী, বারাঙ্গনা, বারবধূ, বারবিলাসিনী, পতিতা, বেশ্যা, ভ্রষ্টা, যৌনকর্মী, রাণ্ডী, রূপোপজীবিনী, হট্টবিলাসিনী ইত্যাদি নামেও অভিহিত করা হয়।বেশ্যা, পতিতা, গণিকা, বন্ধকী, বারাঙ্গনা, খানকি সহ পেশাদার যৌনকর্মীর বাংলায় প্রায় ৩০০টি প্রতিশব্দ আছে। যেহেতু স্বাধীনভাবে জীবিকা বেছে নেবার সুযোগ রয়েছে সেহেতু আধুনিক যুগে এই পেশায় জড়িতদের আভিধানের কোনো হীন নামে অভিহিত না করে পেশাজীবী যৌনকর্মী বা পেশাদার যৌনকর্মী বলে অভিহিত করা হয়।
 “যারা দারিদ্র, প্রতারণা, জবরদস্তি, অসহায়ত্ব এবং অন্যান্য প্রতিকূল অবস্থার শিকার হয়ে অর্থ বা উপঢৌকনের বিনিময়ে যৌন কর্মকান্ডে লিপ্ত তথা নৈতিকতা পরিপন্থী পেশায় নিয়োজিত হয়” তাদের বাংলাদেশ সরকার “সামাজিক প্রতিবন্ধী মেয়ে” হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ সালে রচিত কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে যৌনকর্মীদের উল্লেখ রয়েছে, যাতে তাদের বার্ষিক আয় ১,০০০ পণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থশাস্ত্রের সমসাময়িক রচনা বাৎস্যায়নের কামসূত্র অনুসারে প্রাচীনকালে যৌনকর্ম ছিলো একটি বিকশিত কলাবিদ্যা। তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে এটি স্বীকৃত পেশা হলেও এটি সর্বদা সম্মানজনক পেশা ছিলো না।
 সূত্রমতে,  প্রাচীনকালে নারীদের নৃত্য পরিবেশনাও যৌনসেবার অংশ ছিলো, এবং এই পেশায় জড়িতদের বলা হতো নটিনী, গণিকা বা নর্তকী।
 সূত্রমতে, একসময়ে বাংলাদেশের বেদে নারীরা যৌনপেশায় নিযুক্ত ছিলেন, যদিও এখন তারা অধিকাংশই মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করেছেন এবং এ পেশায় আর নিযুক্ত হননা।
এদিকে বাংলাদেশ সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগ, ১৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “গণিকাবৃত্তি ও জুয়াখেলা নিরোধের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন৷ সংবিধানে পতিতাবৃত্তিকে নিরুৎসাহিত ও এই পেশা বন্ধ করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হলেও আইনে ১৮ বছর বয়স হলে কোনো নারী আদালতে ঘোষণা দিয়ে পেশা হিসেবে যৌনকর্ম বেছে নিতে পারেন৷ বাংলাদেশ পৃথিবীর স্বল্পসংখ্যক দেশগুলোর একটি যেখানে পেশাদার যৌনকর্ম একই সাথে বৈধ এবং অবৈধ।
এরআগে টানবাজার ও নিমতলী যৌনপল্লি উচ্ছেদ প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে ১৯৯৯ সালে ১০০জন যৌনকর্মী বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার সহায়তায় হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করলে আদালত ২০০০ সালের রায়ে পেশাদার যৌনকর্ম বৈধ বলে ঘোষণা দেন। পিটিশনের রায়ে বলা হয়, নারী যৌনকর্মী অনূর্ধ্ব ১৮ বছরের হলে এবং যৌন ব্যবসাই তার একমাত্র আয়ের উৎস হিসেবে প্রমাণ করতে পারলে তিনি বৈধভাবে এই ব্যবসায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন। রায়ে আরো বলা হয় যে, যৌনপল্লি উচ্ছেদের সরকারি উদ্যোগটি অবৈধ।
রাষ্ট্র বনাম বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা (২০০০) মামলার এই রায়ে আরো বলা হয় যে জীবন ও জীবিকার স্বাধীনতা এবং আইনের সুরক্ষার সাংবিধানিক অধিকার যৌনকর্মীদের জন্যেও প্রযোজ্য এবং তাদের জীবিকার অধিকার হরণ করা বেআইনি। উচ্চ আদালত আরো বলেন যে, অনৈতিক কার্যক্রম দমন আইন ১৯৩৩ (যাকে পতিতা আইনও বলা হয়) এবং ১৮৬০-এর দন্ডবিধি অনুসারে যৌনপল্লি পরিচালনা ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌনকর্মে নিয়োগ নিষিদ্ধ হলেও পেশাদার যৌনকর্ম কোনো আইনেই নিষিদ্ধ নয়। পেশাদার নারী যৌনকর্ম বৈধ হলেও পেশাদার পুরুষ যৌনকর্ম অবৈধ, যদিও বিভিন্নস্থানে তার প্রচলন রয়েছে।
আমাদের জনসংখ্যার ৯০ ভাগের অধিক ইসলাম ধর্মাবলম্বী। পৃথিবীর ধর্মমতসমূহের মধ্যে ব্যভিচার, দেহব্যবসা বা যৌনতার বিরুদ্ধে ইসলামের অবস্থান সবচেয়ে কঠোর। একজন ব্যভিচারীর জন্য ইসলামে যে শাস্তির বিধান করা হয়েছে সেটি হলো পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমে মৃত্যু কার্যকর। আমাদের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম হলেও আমাদের দেশে ইসলামি শাসনব্যবস্থা চালু নেই। তথাপিও সংবিধানের চেতনার আলোকে পতিতাবৃত্তি নিরোধ বিষয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের কার্যকর উদ্যোগ আবশ্যক।
আইনি দিক থেকে জবরদস্তিমূলক শ্রম এবং ‘পতিতাবৃত্তি বাংলাদেশে নিষিদ্ধ। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৪(১) অনুচ্ছেদে জবরদস্তিমূলক শ্রম আদায়কে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আর ১৮(২) অনুচ্ছেদে ‘পতিতা’বৃত্তিকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এ পাচারের জন্য শাস্তির বিধান করা হয়েছে। আইনটিতে পাচারের জন্য শাস্তি থাকলেও ভিকটিমের পূনর্বাসনের কোনো বিধান নেই।  আর পাচারের ঘটনাগুলো ঘটে মূলত সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে। আইনটির মূল সমস্যা হলো এতে সংঘবদ্ধ চক্রের কোনো সংজ্ঞা এবং সংঘবদ্ধভাবে পাচারের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিধান নেই। ফলে আইনটি অনেকখানিই অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
এবার আসি মুল কথায়, পতিতা বৃত্তি নিয়ে নানাভাবে বৈধতা আর অবৈধতার আলোচ্যসুচিতে তারা দোষী বা নির্দোষ বলা যায়। কিন্তু খদ্দেরের পরিণতি কি হবে? খদ্দেররা ভদ্রবেশে পতিতাদের রক্ষা করে চলে। নিজে সমাজের সম্মান আদায় করে নেয় ছদ্মবেশে। কিন্তু বৈষম্য কেবল নারীর প্রতি।
মোটকথা, সমাজে অন্যসব অপরাধীকে যদি পতিতাদের মতো ঘৃণা করা হতো তবে সব অপরাধীই সতর্ক হতো। ছেড়ে যেতো সব অপরাধ।  বৈষম্যমুলক সামাজিক শাস্তি কোন কারনেই গ্রহণ যোগ্য নয়। যে পতিতাকে দিনের বেলায় বক্তব্যে, লেখায়, মঞ্চে ঘৃণা করা হয় সুযোগে সে পতিতা দিয়ে রাতে রঙ্গ মঞ্চে বুকে টেনে নেয়া হয়। এমন চরিত্র কখনো সমাজে নীতি ছড়াবে না বরং নীতির কবর দেয়া হবে।
নীতি নৈতিকতায় দৃষ্টিকোণ বলি আর ধর্মীয় দৃষ্টিকোণে কোনটাতেই যেমন পতিতাবৃত্তি সমর্থনযোগ্য নয় তেমনি পতিতাদের অপরাধী হিসেবে ঘৃণার পাশাপাশি খদ্দেরগুলোকে চিহ্নিত করা অতীব প্রয়োজন।
লেখক: সাংবাদিক
মাহবুব আলম প্রিয়


এই বিভাগের আরও খবর