বিআরটিসি বাস সহ পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির অভিযোগ দর্শনার্থীদের
মাহবুব আলম প্রিয়ঃ
গতবছর মেলা থেকে ২০০ কোটি টাকা মূল্যের পণ্য রপ্তানি আদেশ এবার ছাড়িয়ে যাবে ৫শ কোটির অংক। বিগত দিনে শীতের আবহ আর যানজটের প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে শুক্রবার দিনভর মেলায় ছিলো লক্ষাধিক লোকের সমাগম। তবে রাজধানী থেকে আসা বাণিজ্য মেলার দর্শনার্থীদের পরিবহনের যান বিআরটিসি ও স্থানীয় সিএনজি অটোরিকশা ওয়ালাদের অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ে ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন দর্শনার্থীরা।
১৩ জানুয়ারি শুক্রবার সকাল থেকে মেলার প্রবেশ করতে দেখা গেছে বিপুল পরিমাণ দর্শনার্থীর। বেচাকেনাও হয়েছে গত দিনের তুলনায় বেশি। মেলার অভ্যন্তরীণ প্যাভিলিয়ন ও সল্টগুলো ছিলো কানায় কানায় পূর্ণ।ব্লেজার বিক্রেতা, শীতের কাপড়ে দেয়া হয়েছে বিশেষ ছাড়। ফলে বেড়েছে বেচাকেনা ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি। এদিকে মেলায় আয়োজকদের প্রত্যাশা এবার ৫শ কোটি টাকার রপ্তানি আদেশের পাবে মেলা থেকে । এবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের পাশাপাশি আরও ১০টি পণ্য রপ্তানি বাড়ানোর বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। এমনটাই জানালেন মেলার আয়োজকরা। এতোদিন শীত আর নানা সংকটে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় দর্শনার্থীর সংখ্যা কম থাকলেও রোদের দেখা দেওয়ায় পর থেকে জমে উঠতে শুরু করেছিলো। গতকাল ইজতেমা ও স্থানীয় ঢাকা বাইপাস সড়কের দূর্ঘটনার কারনে সারাদিন ছিলো ক্রেতাশুন্যতা। শুক্রবার সকালে তেমন লোক না আসলেও দুপুর থেকেশুরু হয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দর্শনার্থীদের আনাগোনা। এদিকে দর্শনার্থী ও ক্রেতা আকৃষ্ট করতে মেলার ব্যবসায়ীরা তাদের পন্যমুল্যে ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছেন। বেশি ক্রেতা পেয়ে ব্যবসায়ীদের নিয়োজিত লোকজন ক্রেতাদের হাতে ধরে স্টল পরিদর্শনে আহবান জানাচ্ছেন ও স্ব স্ব পন্য দেখাচ্ছেন। তাদের অনেকেই ছাড় দিতে শুরু করেছেন। এ ছাড়ের পরিমাণ আরও বাড়বে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তবে এখনো দর্শনার্থীদের পন্যমুল্য নিয়ে রয়েছে অভিযোগ।
সরেজমিন ঘুরে আরও জানা যায়, পূর্বাচলের স্থায়ী প্যাভিলিয়নের ২য় আসরের ১৩ তম দিন সকালের জলমলে পরিবেশ। তাই শীতের তীব্রতা না থাকায় দুপুর থেকে মেলায় আসতে শুরু করে বিপুল পরিমাণ দর্শনার্থী।
মেলায় ঘুরতে আসা কুমিল্লার বাসিন্দা ও নাগরিক টিভির (এইচ আর এডমিন) কর্মকর্তা শুনানদা চক্রবর্তী বলেন, এ বছর মেলায় প্রথমবারের মতো আসলাম। স্থায়ী প্যাভিলিয়নে বিশাল পরিসরের চমৎকার আয়োজন ভালো লাগলো। তবে মেলার ভেতরের কিছু পন্যের দাম বেশি হাঁকা হচ্ছে। ক্রয় করতেও বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে। এতে সাধারণ ক্রেতারা নিরুৎসাহিত হবেন।
নিকুঞ্জ এলাকার বাসিন্দা মাহফুজ মিয়া বলেন, আমি বিশ্বের অন্যান্য দেশের মেলা ঘুরে দেখেছি। আমাদের মেলার আয়োজন আন্তর্জাতিক মানের হয়েছে। বিশেষ করে, প্রশংসনীয় সব আয়োজন। এ সময় তিনি বলেন, দেশের অতীতের সব মেলার আয়োজনই ১ম ১০ দিন খুব একটা জমে না। ১০ দিন গেলেই জমে ওঠে।
এদিকে মেলায় আগত দর্শনার্থীদের যাতায়াতে ৬৫ টি বিআরটিসি বাসের ভাড়া কুড়িল থেকে মেলা প্রাঙ্গণে ৩৫ টাকা বলা হলেও তা রাখা হচ্ছে ৪০ টাকা। এছাড়াও মেলা থেকে ৫ শ মিটার দূরে নামিয়ে দেয়ার অভিযোগ করেন ক্ষিলক্ষেত থেকে আসা দর্শনার্থী মোন্তাসির মাহমুদ। তিনি বলেন, বাস থেকে নেমে পায়ে হেটে মেলায় আসতে হয়েছে। এরপর টিকেট কাটতে দীর্ঘ লাইনে দাড়িয়ে কিছুটা হয়রানি হতে হয়েছে।
পিতলগঞ্জের বাসিন্দা গাজী গোলাম রসুল কাজল বলেন, স্থানীয় লোকদের মেলায় প্রবেশের একমাত্র রাস্তা মুশুরী থেকে হাবিন নগর ৪ কিলোমিটার পুরোটাই অচল। এ সড়কে মেলায় আগত দর্শনার্থীদের কাছ থেকে দিগুন তিনগুন ভাড়া আদায় করছে। যা ভোগান্তির শামিল।
বাইরের দায়িত্বরত আইন শৃঙ্খলা বাহীনি ছাড়াও রূপগঞ্জ থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এএফএম সায়েদের নেতৃত্বে অতিরিক্ত সদস্যরা কাজ করছেন। এখানে ৭৪১ জন পোষাকে ও সাদা পোষাকে দায়িত্বরত।
স্থানীয় বাসিন্দা আমিনুল হক ঝিনু ভুইয়া বলেন, মেলায় দর্শনার্থীদের পরিবহনের জন্য যারা নিয়োজিত তারা অমানবিক আচরন শুরু করেছে। যার ফলে ৩০ টাকার ভাড়া ৫০ টাকা নিচ্ছে। এদিকে স্থানীয় সিএনজি চালক বাবুল মিয়া বলেন, মেলার প্রবেশ করতে যানজটের শিকার হতে হয়। তাই একটু বেশি রাখা হয়। আর মেলা তো সব সময় না। তাই গরীব মানুষ হিসেবে চেয়ে নেই এতে কারো অভিযোগ থাকেনা। জাঙ্গীরের বাসিন্দা ও মেলায় কর্মরত স্বেচ্ছাসেবক হৃদয় মিয়া বলেন, মেলায় আজ রেকর্ড সংখ্যক লোক হয়েছে। বেচাকেনা বেড়েছে। বিকালে প্রচুর দর্শনার্থী পেয়েছি। তাই মেলার অন্য ব্যবসায়ীরাও ছাড় দেয়া শুরু করেছে। এবার আসরটি পুরোপুরি জমজমাট হবে।
ডেমরা থেকে মেলায় ঘুরতে আসা ব্যবসায়ী ওয়াজেদুল ইসলাম বলেন, মেলার সরকারী ছুটির দিন থাকায় লোকজন বেশি। ভীর ঠেলে কেনাকাটা করতে হয়েছে। তবে সব কিছু একসনে পেয়েছি। যা ভালো লাগছে।
মি. বাইট নামীয় খাবার হোটেলের পরিচালক প্রকৌশলী খোকন বলেন, বাণিজ্য মেলার আসর রূপগঞ্জে হওয়াতে স্থানীয় শিক্ষিত যুবকদের কর্মসংস্থান হয়েছে। এবার গতবারের তুলনায় দর্শনার্থী হচ্ছে বহুগুন বেশি। তিনি আরও বলেন, মেলার শুরু থেকে স্কুলে ভর্তি নিয়ে ব্যস্ততা আর শীত বেশি থাকায় লোকজন প্রথমে আসেনি। এখন সময় পেয়ে সবাই আসা শুরু করেছে।
মধুখালী এলাকার বাসিন্দা শিক্ষার্থী ইমলা মুহান্না বলেন, পূর্বাচলে দ্বিতীয়বারের মতো বাণিজ্যমেলায় শিশুপার্ক রাখায় আমাদের ভালো লেগেছে। তবে মেলার খেলনা পন্যের দাম রাখা হচ্ছে বেশি।
সূত্র জানায়, এবার মেলায় সাধারণ, প্রিমিয়াম, সংরক্ষিত, ফুড স্টল ও রেস্তোরসহ ১৩ ক্যাটাগরিতে স্টল রয়েছে। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে রয়েছে বঙ্গবন্ধু প্যাভিলিয়ন। এবার দেশি-বিদেশি মিলে মেলায় মোট ৩৩৩ টি স্টল, প্যাভিলিয়ন, মিনি প্যাভিলিয়ন রয়েছে। গতবার এই সংখ্যা ছিল ২২৫টি।
দেশি প্রতিষ্ঠান ছাড়াও সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, কোরিয়া, ভারতসহ ১০টি বিদেশি রাষ্ট্রের ১৭টি প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশ নিয়েছে। এছাড়া গতবার শিশুপার্ক ছিল না, এবার মিনি শিশুপার্ক রয়েছে। যদিও এটি বেসরকারি উদ্যোগে। আবার দর্শনার্থীদের আনা-নেওয়ার জন্য ৫০টি শাটল বাস চালু করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন। বাসের ভাড়া যাত্রীপ্রতি ৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিকাশের মাধ্যমে ভাড়া পরিশোধ করলে যাত্রীরা ৫০ শতাংশ ছাড়ও পাবেন।
এবার মেলায় প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৪০ টাকা এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ২০ টাকা প্রবেশ মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রবেশ মূল্য ফ্রি।
মেলা খোলা থাকবে সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। তবে ছুটির দিনে এক ঘণ্টা বাড়িয়ে সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। এছাড়া মেলায় প্রায় ১ হাজার গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখা রয়েছে।