মাহবুব আলম প্রিয়ঃ
রুচি নিয়ে কথা বলার আগে আমাকে ভাবতে হবে আমি কোন রুচির কথা বলছি। আজকাল সর্বত্র যেন রুচিহীন, মানহীনদের ছড়াছড়ি। ধর্ম,কর্ম, সমাজ, শিল্প, সংস্কৃতি, রাজনীতি, শিক্ষক, সাংবাদিকতায় অরুচিহীন আচরনের চিত্র প্রকাশ্য দেখা যায়। আরও নানা ক্ষেত্রে একই অবস্থা। ধর্ম হচ্ছে মনগড়া। কর্মে করছে নয় ছয়। সমাজে সব উলট পালট, নীতির নাই দাপট। শিল্প কোনটা শিল্পী কারা সঙ্গা আজ বিলীন। যে যার মতো দাবী করে সেরা শিল্পী। সংস্কৃতির নামে যা খুশি তা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে নেটিজেনদের কাছে ভাইরাল হলে বনে যায় কথিত জনপ্রিয় জন। রাজনীতির মাঠে নেতার পা চেটে অনেকেই যোগ্য না হয়েও পদ পদবী দখল করে নেয়। যাদের উপলব্ধি থাকে না আসলে রাজনীতির কাজ কি? অথচ ওই পদধারীদের কেউ কেউ ভাইরাল, টাকা ছড়িয়ে, বা জোর ক্ষমতা দেখিয়ে নানা ছলাকলে হয়ে যায় জনপ্রতিনিধি। তারপর? ঠেকায় কে?
এবার আসি রুচির কথায়। জাহেলিয়াতের যুগে আরবের সংস্কৃতি ছিল মদ্যপান, হইহল্লোর, উলঙ্গপনা, অবাধ ও যথেচ্ছ যৌনাচার, ধর্ষণ কিংবা পায়ুকাম। তো সেই সব আইয়ামে জাহেলিয়াতের সংস্কৃতিকে আরব জাতির ঐতিহ্য বলা হয় না। আরবের মরুভূমির বিশালতা, মরুবাসীর উদারতা, বীরত্ব মেহমানদারী এবং গল্প কবিতা উপন্যাসের সৌকর্যই হলো আরবীয় ঐতিহ্য।
নাট্যজন মামুনুর রশিদের একটি মন্তব্য নিয়ে সারা দেশে রীতিমতো তুলকালাম কাণ্ড ঘটে যাচ্ছে। সম্প্রতি অভিনয় শিল্পী সংঘের একটি অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের নাটক-সিনেমা তথা সংস্কৃতি অঙ্গনের নামকরা ব্যক্তিত্ব মামুনুর রশিদ মন্তব্য করেন যে, আমরা একটা রুচির দুর্ভিক্ষের মধ্যে পড়ে গেছি। সেখান থেকে হিরো আলমের মতো একটা লোকের উত্থান হয়েছে। যে উত্থান কুরুচি, কুশিক্ষা ও অপসংস্কৃতির, তেমনি আমাদের সাংস্কৃতিক সমস্যাও।
মামুনুর রশিদ বাংলাদেশের অত্যন্ত আলোচিত গুণী শিল্পী। তিনি দেশের রাজনীতির সমস্যা এবং সাংস্কৃতিক সমস্যায় রুচিবোধকে দায়ী করেছেন মাত্র। যার বাস্তবতা রয়েছে। কথার গ্রহণযোগ্যতাও রয়েছে। তার আত্ম উপলব্ধিকে স্বাতগ জানিয়েছেন সচেতনমহল। তবে হিরো আলম নামীয় ভাইরাল অভিনেতা ও সমাজসেবীর উত্থানকে রুচির মানভেদে বিচার না করে নেটিজেনদের কাছে আগ্রহের ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেছে। আমাদের আবহমান বাংলার চলমান রূপ মাধুর্য এখন আর মামুনুর রশিদ কিংবা আব্দুল্লাহ আল মামুন, আতিকুল হক চৌধুরী কিংবা আলী যাকের-আসাদুজ্জামান নূরদের আলোচনা হয় না। নেটিজেনরা আবেগকে গ্রহণ করেছে। ফলে হিরো আলমদের উত্থান ঘটে।
শুধুমাত্র পদ্ধতিগত ও নীতিহীনতার দাপটে আজকাল রাজনীতির বিকৃত রুচি যেমন দায়ী তেমনি পচা দুর্গন্ধময় রাজনীতির বর্জ্য ও বমন লেহনকারী তথাকথিত কবি-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, ধর্মীয় নেতা, সাংবাদিক, আমলা-কামলা-ব্যবসায়ীরাও কম দায়ী নন। ক্ষমতার মসনদে বসে দুর্বৃত্তায়ন সব সমাজেই ছিল। কিন্তু যে সমাজ বা কাল দুর্বৃত্তায়নকে মেনে নিয়েছে সেখানেই সাধারণ মানুষের বোধ-বুদ্ধির ওপর মহামারী রূপ নিয়েছে। বিশেষ প্লাটফর্মগুলো দখলে নিচ্ছে ধড়িবাজ মতলববাজ কিংবা ফন্দিবাজ প্রকৃতির নিকৃষ্টরা। এসব কারনে সচেতন নাগরিকরা রাজনীতিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। রাজনীতির দুর্গন্ধে আমাদের জাতীয় বিবেক-বুদ্ধি এবং রুচিতে দুর্ভিক্ষের ছায়া লেগেছে।
মুলত, দেশে রুচির দুর্ভিক্ষ যখন শুরু হয়ে যায় তখন বেশির ভাগ জনগণ ভালোমন্দের পার্থক্য নিরূপণ করতে পারে না। তখন তাদের নিকট আদি মাল-পচামাল-রুই-কাতলা-চ্যাপা শুঁটকি অথবা পচা পটকা মাছের স্বাদ একই রকম মনে হয়। তাদের নিকট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, আয়েত আলী খাঁ, আকবর আলী খাঁ, পণ্ডিত রবি শংকর, বিসমিল্লাহ খাঁ, আল্লাহ রাখা খাঁ, জাকির হোসেন প্রমুখকে মেধা মননশীলতায় হিরো আলমদের চেয়েও হীনতর মনে হয়।
রুচি কিংবা অরুচি অথবা বিকৃত রুচি সম্পর্কে যদি বলি, তবে মানতে হবে যে, জাতীয় সংস্কৃতি বিকৃত এবং দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়ে এবং সেই অঙ্গন থেকে কীটপতঙ্গ বের হয়ে আসে। আমরা কমবেশি সবাই জানি যে, একটি জাতির যা কিছু কল্যাণকর এবং যা কিছু নির্মল আনন্দের তাই সংস্কৃতি। জীবনের তাল-লয়-ছন্দ কম্পনে যখন প্রাণের স্পন্দন থাকে এবং সেই কম্পনের সাথে যখন সুর এবং রং লাগে এবং যা কি না অনুরণিত হয়ে প্রকৃতি ও পরিবেশে আনন্দময়তা ছড়িয়ে দেয়, তাই সংস্কৃতি। সংস্কৃতির হাজার বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দরতম অংশগুলো নিয়ে তৈরি হয় ঐতিহ্য। আমাদের জারি-সারি, যাত্রা পালা সঙ্গীত নৃত্যের শত শত বছরের স্বর্ণালী সৃষ্টি গল্প কবিতা, উপন্যাস, চিত্রপটের শত বছরের হৃদয় তোলপাড় করা অংশটুকুই সংস্কৃতির ঐতিহ্য। আমাদের গামছা-নেংটি-ধুতি-লুঙ্গি-শাড়ি-গয়না ইত্যাদি যেমন সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে তেমনি সেসব সংস্কৃতির মধ্যে যেগুলো অনাগত দুনিয়া স্মরণ করবে এবং ধারণ করতে গর্ব অনুভব করবে সেগুলোই সংস্কৃতির ঐতিহ্য।
সংস্কৃতির উদ্ভব হয় কল্পনা থেকে। সেই কল্পনার বাস্তবতা শুরু হয় সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে। সাহিত্য প্রতিষ্ঠা পায় শিক্ষার মাধ্যমে। কেবল উন্নত শিক্ষাই জীবনের মাধুর্যকে পাহাড়-নদী-সমুদ্রে ছন্দাকারে ছড়িয়ে দেয় এবং ছন্দময় জীবনের আনন্দই সংস্কৃতির রূপ নিয়ে প্রকৃতিতে সুর তোলে। অন্য দিকে অশিক্ষা-কুশিক্ষা দুর্গন্ধ ছড়ায় এবং সেই দুর্গন্ধজাত বিকৃত বিনোদন ও সংস্কৃতি কখনো ঐতিহ্য বলে বিবেচিত হয় না।
কিন্তু ভাইরাল জনপ্রিয়তা নামীয় নেটিজেনদের কাছে , পাপিয়াকাণ্ড, শেয়ার লুট, ভোট চুরি, টাকা পাচার, জুলুম, অত্যাচার, গুম, হত্যা, অপহরণ, গ্রেফতার, মামলা, হামলা, চাঁদাবাজি, আয়নাবাজি, মদ, গাঁজা, ইয়াবা, প্রতারণা, জাল-জালিয়াত, মিথ্যাচার, অনাচার, জোচ্চুরি, তেলবাজি, টেন্ডারবাজি, মাস্তানি, দখলদস্যুতা, ভণ্ডামি, মোনাফেকি, প্রভৃতি শব্দমালা সারা বাংলায় ততটা আলোচিত হয়ে যায়। চোর সিদ্দিকও সামাজিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে যায়।
রুচির দূর্ভিক্ষে আজকাল পর্নো তারকা সানি লিয়ন ও নৃত্যশিল্পী নোরা ফাতেহীর বাংলাদেশ আগমন নিয়ে মাতোয়ারা হয়। এভাবে সবখানে সুরুচিহীনতার দাপট বিদ্যমান।
দেশের সাম্প্রতিক আলোচিত প্রসঙ্গ ‘রুচির দুর্ভিক্ষ’ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে রুচি সম্মত নাট্যকার মামুনুর রশিদ নেটিজেনদের সমালোচনায় জড়িয়ে গেছেন। তার লেখা ও পরিচালনায় নাটক, অভিনয়, শৈল্পিক গুণের অধিকারী হিসেবে সুখ্যাতি বিদ্যমান। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কথিত জনপ্রিয় ভাইরাল হিরো আলম তার নানা কর্মে বেশ সমালোচিত। আবার অকপটে স্পষ্টভাষী আর বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে নিজের মতো করে এগিয়ে চলায় ক্রমেই বাড়ছে তার আবেগতারিত ভক্তের সংখ্যা।
তবে মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়৷ যখন বাস্তবতায় দেখি
রুচিহীন উল্লাস চলছে। আমরা রুচির দুর্ভিক্ষের মধ্যে নিমজ্জিত আছি। তাই সচেতন মহলের সঙ্গে আমারও দাবী ‘সুস্থ রুচি’ গড়ে তুলতে প্রগতিশীল সবাইকে সজাগ থাকার।
লেখক: সাংবাদিক
নাগরিক টিভি ও দৈনিক খোলাকাগজ।