নিজস্ব প্রতিনিধি:
ভূমিষ্ট হওয়ার পর পেরিয়ে গেছে ৭ মাস। তবু একবারের জন্যও পিতৃ স্নেহ জোটেনি শিশু এনায়্যা পাটওয়ারী সারার ভাগ্যে। সন্তান প্রসবের প্রাক্কালে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে স্বামীর সাহচার্য মেলেনি গৃহবধূ ইতি আক্তার কপালে। সন্তানের অধিকার আর স্ত্রীর মর্যাদা ফিরে পেতে আইনের দ্বারস্থ হতেই ভাগ্য বিড়ম্বনা ধরা দিল বিমূর্ত রূপে। শ্বশুরের সাজানো মামলা আর স্বামীর ডিভোর্স লেটারে ভেঙ্গে চৌচির ইতির সংসার বোনার স্বপ্ন। ন্যায় বিচার পেতে শিশু কন্যা সমেত তিনি এখন ঘুরছেন দ্বারে দ্বারে। ঘটনাটি ফরিদগঞ্জ উপজেলার গোবিন্দপুর উত্তর ইউনিয়নের চাঁদপুর গ্রামের।
ঘটনার বিবরণে জানা গেছে, গত ২২ নভেম্বর ২০২৪ ইং তারিখে গোবিন্দপুর উত্তর ইউনিয়নের চাঁদপুর গ্রামের আব্দুল কুদ্দুস পন্ডিতের মেয়ে ইতি আক্তারের সাথে পাশ্ববর্তী গোবিন্দপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের হাঁসা গ্রামের মফিজ পাটওয়ারীর ছেলে শরীফ পাটওয়ারীর বিয়ে হয়। বিয়ের কয়েক মাস পর বিভিন্ন সময়ে যৌতুকের দাবীতে স্বামী ও শ্বশুর পরিবারের সদস্যের নিপীড়ন নেমে আসে তার উপর। সেসব সহ্য করেই সংসারে অবিচল থাকেন তিনি। একপর্যায়ে সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়েন ইতি। সময়ের ব্যবধানে গর্ভের সন্তানের লিঙ্গ পরিচয় জানতে পারলে ইতির সাথে শরীফের দাম্পত্য সম্পর্কে ব্যবধান বৃদ্ধি পায়। ইতিকে সুকৌশলে বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দেয় শরীফ ও তার পরিবারের সদস্যরা। সেখানে থেকেই অস্ত্রোপাচারের মাধ্যমে কন্যা এনায়্যার জন্ম দেয় ইতি। বিভিন্ন সময়ে স্বামীর পরিবারে ফিরতে চেয়েও সেসকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়৷ সন্তানের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে এবং স্বামীর সংসারে ফিরে যেতে থানায় একটি অভিযোগ করেন ইতি। অভিযোগের প্রেক্ষিতে উভয় পক্ষকে থানায় ডাকা হলে পক্ষদ্বয় ২১ এপ্রিল ২০২৬ ইং মঙ্গলবার বিষয়টি সামাজিকভাবে মিমাংসার লক্ষ্যে ইতির বাবার বাড়িতে সালিশ বৈঠকে মিলিত হন। গোবিন্দপুর উত্তর ইউপি সদস্য জাকির হোসেন, গোবিন্দপুর দক্ষিণ ইউপি সদস্য মোহেব উল্যাহ মীর, বালিয়া ইউপি সদস্য আব্দুল কাদির, গোবিন্দপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবু তালেব পাটওয়ারী, যুবদল নেতা হেলাল উদ্দিন, মাসুদ আলম, সাংবাদিক মো. ফাহাদ সহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উক্ত বৈঠকে অংশ নেন। কিন্তু বৈঠকে বিষয়টি সুরাহা করতে তারা ব্যর্থ হন। বৈঠক ভেস্তে গেলে পক্ষদ্বয় যার যার মতো চলে যায়। কিন্তু বরের পিতা মফিজ পাটওয়ারী ২৬ এপ্রিল ২০২৬ ইং তারিখে ৮ জনকে অভিযুক্ত করে ফরিদগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। সেখানে তিনি ঘটনাটিকে ২২ এপ্রিল ২০২৬ ইং তারিখে সংগঠিত হয়েছে বলে মিথ্যা তথ্য প্রদান করেন। এমনকি অভিযোগে তিনি কনে পক্ষের সালিশ হেলাল পন্ডিতকে ৪ নং অভিযুক্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন। একই সাথে ২৬ এপ্রিল ২০২৬ ইং তারিখে চাঁদপুর জজ কোর্টের আইনজীবী রেহানা ইয়াসমিনের মাধ্যমে ইতি আক্তারকে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়েছেন স্বামী শরীফ পাটওয়ারী। পিতা-পুত্রের এহেন কর্মকান্ডে বিস্মিত সালিশসহ এলাকাবাসী। তারা ঘটনার ন্যায় বিচার দাবী করেছেন।
এ বিষয়ে ইতি আক্তার বলেন, “ব্যবসার জন্য আমার স্বামী আমার বাবার কাছ থেকে একবার ৫ লক্ষ টাকা নিয়েছেন। দ্বিতীয় দফায় তিনি পুনরায় টাকা চাইলে আমার বাবা টাকা দিতে পারেননি। তারপর থেকে আমি তাদের নিপীড়নের শিকার। আমি সন্তানসম্ভবা থাকা অবস্থায় আমার সেবা শুশ্রূষার অজুহাতে কৌশলে আমাকে বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। আমার এ সন্তান জন্মদান থেকে শুরু করে অদ্যাবধি পর্যন্ত তারা কোন দায়িত্ব পালন করেনি। গত ২১ এপ্রিল মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত সালিশের মাধ্যমেও আমি সাংসারিক জীবনে ফিরে যেতে চেয়েছি। কিন্তু ২১ তারিখের বৈঠককে ২২ এপ্রিল উল্লেখ করে গত ২৬ এপ্রিল আমার শ্বশুর আমাকে এবং স্বজনদের নামে, এমনকি আমাদের একজন সালিশের নামেও মিথ্যা ঘটনা সাজিয়ে মামলা করছেন। একই দিনে আমার স্বামীর পক্ষ থেকে ডিভোর্স লেটার ইস্যু করা হয়েছে। আমার সংসারের স্বপ্ন তছনছ হয়ে গেছে। আপনারা আমার সন্তানের দিকে তাকিয়ে হলেও ন্যায় বিচার এনে দিন।”
গোবিন্দপুর উত্তর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য জাকির হোসেন বলেন, “২১ এপ্রিল মঙ্গলবার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে বিষয়টি সমাধান করা সম্ভব হয়নি। তবে বৈঠকে কোন রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ঘটনা ঘটেনি। শিশুটির দিকে তাকিয়ে হলেও ন্যায় বিচার হওয়া প্রয়োজন।”
ইউপি সদস্য মোহেব উল্যাহ মীর বলেন, “বিষয়টি সামাজিকভাবে মিমাংসার স্বার্থে আমরা গত ২১ এপ্রিল মঙ্গলবার একটি সালিশ বৈঠক করি। উভয় পক্ষের উত্তেজিত আচরনের কারণে বৈঠকটি ভেস্তে যায়। একপর্যায়ে আমি মোটরসাইকেলে শরীফকে নিয়ে চলে আসি। বৈঠকে কোন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি।”
ইতির শ্বশুর মফিজ পাটওয়ারী ঘটনাটিকে ২২ এপ্রিলের বলে দাবী করেন। তিনি বলেন, “বৈঠকে একজন সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। তিনি ঘরের ভিতর মারামারির ভিডিও না করলেও, আমরা বের হয়ে যাওয়ার সময় ভিডিও করেছেন।”
বৈঠকে উপস্থিত বেসরকারী টেলিভিশন মোহনা টিভির চাঁদপুর প্রতিনিধি মো. ফাহাদ বলেন, “বৈঠকটি ২১ এপ্রিল মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে কোন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি। আমার কাছে ঘটনার ভিডিও সংরক্ষিত রয়েছে। মামলার বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং পরিকল্পিত। তাছাড়া ২৬ এপ্রিল ডিভোর্স লেটার ইস্যু করতে শরীফ চাঁদপুরে নোটারী পাবলিকের কার্যালয়ে হাজির হলেন। অথচ মামলা বাদী হলেন তার বাবা মফিজ পাটওয়ারী। শরীফ নিজে ভিকটিম হয়েও তিনি কেন মামলার বাদী হননি? সে বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফরিদগঞ্জ থানা পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক মো. জুমায়েত হোসেন বলেন, “ইতি আক্তারের অভিযোগটি আমার তত্ত্বাবধানে আছে। ২১ এপ্রিল ২০২৬ ইং মঙ্গলবার ছেলে পক্ষের মোহেব উল্যাহ মেম্বার এবং মেয়ে পক্ষে হেলাল পন্ডিত বিষয়টি স্থানীয়ভাবে মিমাংসার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু বিষয়টি তারা সেদিন মিমাংসা করতে পারেনি। তবে এ ঘটনায় কোন রক্তক্ষয়ী সংঘাতের বিষয়ে কোন পক্ষ থেকেই আমি অবগত নই।”
ফরিদগঞ্জ থানার ওসি মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, “গৃহবধূ ইতির অভিযোগ এবং তার শ্বশুর মফিজ পাটওয়ারীর মামলা দুটিই তদন্তাধীন রয়েছে।”