— মাহবুব আলম প্রিয়—
একদিকে কৃষি জমির পরিমাণ কমে আসছে অব্যাহত আবাসন বৃদ্ধির ফলে। যা কৃষি জমি আছে তাতে ফলন ভালো হলেও বাজার মুল্য পাচ্ছেনা কৃষকরা। আবার উৎপাদন ব্যয় মেটাতে ও শ্রমিক মুল্য দিতে গিয়ে লোকসান গুনছেন তারা। এভাবে অনুৎসাহিত হচ্ছেন বারাবার। তাই হুমকীতে আছে আমাদের কৃষি ফসল ও সোনাফলা কৃষকার। অন্যদিকে সিন্ডিকেট নামের দল, মধ্যস্বত্বভোগী দালাল শ্রেণিদের দৌড়াত্ম্যের কারনে যারা ফসল ফলায় তারা বঞ্চিত হয় পন্যের ন্যায্যমূল্য থেকে। কথা হলো, কার অধিকার চাওয়ার নেই? সবাই সবার অবস্থান থেকে আরো চাই আরো চাই করতে থাকি। বাস্তবতা হলো, সম্প্রতি চা শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকারের আন্দোলনে সাড়া ফেলেছে গোটা দেশে। এ যুগে এসেও একজন শ্রমিক দিনশেষে মাত্র ১২০ টাকা মুজুরী পান। যা অতীব দুঃখের বিষয়। অথচ চায়ের বাজার ও চাহিদা দেশকে ছাড়িয়ে বাইরের দেশেও সমান দাপুটে অবস্থান। তাছাড়া এ দেশের উর্বর মাটিতে চা ফলানোর উপযুক্ত পরিবেশ রয়েছে। এমন নয় যে, চা অলাভজনক কোন পন্য। অথচ একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘ বছর ধরে গরীবের রক্তচোষার মতো হীনমন্য আচরন করে আসছে। নিঃসন্দেহে তাদের যৌক্তিক দাবী ৩০০ টাকা মুজুরী দেয়া চা শিল্প সংশ্লিষ্টদের মেনে নেয়াই উচিত। কিন্তু এ উচিত কান্ডটি যখন চা বাগান মালিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা মেনে নেবেন তখন বাজারের এককাপ রং চা ৫ টাকার পরিবর্তে ২০ টাকা হবে না এমন নিশ্চয়তা দেবে কে?
চা সংশ্লিষ্ট উৎপাদকরা যুক্তি তুলে ধরবেন, শ্রমিকদের ব্যয় বেড়েছে তাই এখন চায়ের দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই। তাহলে কী দাড়ালো? সরাসরি আপনি আমি বাধ্য হলাম শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার দিতে গিয়ে অতিমূল্যে চা পানে ঝুঁকতে। কথায় আছে, কৃষক চায় ন্যায্য মূল্য, ভোক্তা চায় কম মূল্য আর ব্যবসায়ী চায় বেশী মূল্য। এ তিন মূল্য সমন্বয় করে সকলকে সন্তুষ্ট করা বেশ চ্যালেঞ্জিং বটে। গত বছর তরমুজের মুল্য নিয়ে এমন নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরী হলে মোবাইল কোর্ট পর্যন্ত কৃষকের খেতে পৌঁছেছে। যত অধিকারের আন্দোলনই হোক না কেন। এর প্রভাব পড়ে গোটা সমাজের তৃণমূলের কাছে পর্যন্ত । সম্প্রতি জ্বালানী তেলের মুল্য বৃদ্ধির প্রভাব সব শ্রেণি পেশার লোকজনের উপর পড়েছে। বাজারের প্রায় সব পন্য মুল্য এখন দ্বিগুন দামে কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের তথা আমাদের। কেন এমন হচ্ছে? সহজ উত্তর হলো, ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফা অর্জনের জন্য হরেক-রকম যুক্তি বা নানা অযুহাত দাড় করায়। বাস্তবে, কৃষকের প্রাপ্ত মূল্য আর খুচরা মূল্যের মধ্যে তফাৎ বেশি। যা ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফা লাভের মানসিকতা মাত্র। ফলে আমরা ক্রেতাগণ সরকারের কাছো সহনীয় দাম নির্ধারণের দাবি উঠাই। কারন, পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেওয়াটাই আধুনিক বাজার ব্যবস্থাপনার মধ্যে পড়ে। অথচ ফড়িয়াদের দৌরাত্ন্য এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের যোগসাজসই কৃষক ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার প্রধান কারণ।
বিদ্যমান বাজার ব্যবস্থায় একটি পণ্য উৎপাদিত হওয়ার পর কৃষক থেকে ফড়িয়া বা বেপারী বা পাইকারী ব্যবসায়ী সরাসরি ক্রয় করে থাকেন। ফড়িয়া বা বেপারী বা পাইকার এদেরকে মধ্যসত্বভোগী ব্যবসায়ীও বলা হয়ে থাকে। তারা ক্রয়কৃত পণ্যটি সরাসরি আড়তদারের নিকট বিক্রি করে থাকেন। আড়তদার লাভের উপর নির্দিষ্ট কমিশনে খুচরা বা পাইকারী ব্যবসায়ীদের নিকট পণ্য বিক্রয় করে থাকেন। খুচরা ব্যবসায়ীরা সরাসরি কৃষক বা ফড়িয়া, বেপারী ও পাইকারী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও পণ্য কিনে থাকেন। কৃষক ছাড়া বাকী সব ব্যবসায়ীদের মাঝে একটি নিবিড় সম্পর্ক থাকে। অনেক ক্ষেত্রে সেটাকে যোগসাজস বা সিন্ডিকেট বলা হয়। মূলত খুচরা বাজারে দাম বৃ্দ্ধির অন্যতম কারণ হলো এই সিন্ডিকেট। এ সিন্ডিকেট এতো শক্তিশালী হয়ে পড়ে যে, সরকারকেও বেকায়দায় ফেলে দিতে পারে। তাদের নিযন্ত্রণ করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ হিমসিম পরিস্থিতিতে পড়ে৷ বেশীরভাগ কৃষি পণ্য যেহেতু পচনশীল তাই এটা বেশীদিন ধরে রাখাও যায় না। আবার ধরে রাখার মতো সংরক্ষনাগারের খুব অভাব। ফলে অনেকটা বাধ্য হয়ে তড়িঘড়ি করে অথবা আগাম পণ্য বিক্রি করে দেয়। ফলে ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয় কৃষক ।
এ সুবিধাটা গ্রহণ করে সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা। তারা কৃষকের কাছ থেকে ক্রয়করা পন্য গুদামজাত করে মজুদ করে বাজারে দাম বাড়িয়ে পড়ে সরবরাহ করে। এ ক্ষেত্রে অনেকটা নির্বিকার কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। তাদের অযুহাত কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের লোকবল ইউনিয়ন বা উপজেলা পর্যায়ে নাই। আছে শুধু জেলা পর্যায়ে সীমিত জনবল নিয়ে। ফলে জেলা পর্যায়ে বাজার মনিটরিং করতেই তাদের হিমশিম খেতে হয়। এভাবে কৃষক জিম্মি হয়ে পড়ে সিন্ডিকেটের কাছে৷
তাহলে উপায় কী? উপায় হলো, কৃষকদের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য উৎপাদন খরচ কমানোর সামগ্রিক পরিবেশ। সে সাথে ব্যবসায়ী আর কৃষকদের মাঝে যোগাযোগ স্থাপন করা প্রয়োজন। মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট ভঙ্গ করতে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে কঠোরতা দরকার। কৃষক- গবেষক- সম্প্রসারণ কর্মী-ব্যবসায়ীদের মধ্যে সংযোগ সাধন অতীব জরুরি। এবারও কথা একটাই, ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতের দাবী পুরণ হলে ফের দাম বাড়াবে ওই সিন্ডিকেট। এর কুপ্রভাব পড়বে পুরো বাজারে। আবারো আমজনতার পকেট কেটে। তাই এমন সিন্ডিকেট ভাঙ্গতে প্রয়োজন পণ্য পরিবহনকালীন চাঁদা বন্ধকরণ, অপচয় কমানো, প্রত্যন্ত অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নতকরণ, ব্লক বা ইউনিয়ন পর্যায়ে পর্যাপ্ত কালেকশন সেন্টার স্থাপন, ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষি ও বিপণন সেবা চালুকরণ, উপজেলা পর্যায়ে সংরক্ষণাগার বা প্যাক-হাউস স্থাপন এবং জেলা পর্যায়ে কৃষি পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা স্থাপন করা সময়ের দাবী। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। এমন উপলব্ধি এখন কাগজে কলমে হলেও কৃষকবান্ধব পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করতে হবে এখনই। নয়তো সিন্ডিকেট রেখে যতই কৃষকের অধিকারের কথা বলবো ততই পকেট কাটবে আমাদের। কারন সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের মুল পূঁজি হলো সিন্ডিকেটকে শক্তিশালীকরণ। সুতরাং কৃষক ফসলের ন্যায্য মূল্য পাক, আমরা ভোক্তারা আমাদের সহনীয় পর্যায়ে পন্য ক্রয়ের নিশ্চয়তা চাই।
এবার আসি আমাদের দেশের শ্রমিক আন্দোলন চরিত্র নিয়ে কিছু কথায়। সারা বছরই শিল্পকারখানা অঞ্চলে কর্মমূখর পরিবেশ দেখি কিন্তু বেতন পাওনা নিয়ে উৎসব এলেই একটি অস্থির পরিবেশ সৃষ্টি হয়। শ্রমিক মালিকের মাঝে সাংঘর্ষিক চিত্র ও দৃশ্যপট তৈরী হয়৷ বলাবাহুল্য, পোশাক খাতে শ্রমিক আন্দোলনের যেমন বড় ভূমিকা আছে, তেমনি ব্যাংক ও সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানে সিবিএকে ক্ষমতা, বিত্তের উৎস মনে করা হয়৷
বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলের এখন শ্রমিক শাখা রয়েছে৷ ওই দলগুলোর নামে কেন্দ্রীয় থেকে শুরু করে ইউনিট পর্যন্ত শ্রমিক সংগঠনের শাখা রয়েছে৷ শ্রমিক নেতারা এখন মন্ত্রী হন, অতীতেও হয়েছেন৷ পাটকলগুলোর শ্রমিক সংগঠন এক সময় খুব প্রভাবশালী ছিল৷ তাদের নেতারা জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতেন৷ নৌমন্ত্রী শাহজাহান খান একই সঙ্গে মন্ত্রী এবং পরিবহণ শ্রমিকদের শীর্ষ নেতা৷ তাঁর প্রভাবের কারণে সড়ক পরিবহণ নিয়ে জনবান্ধব আইন করা যায় না বলেও রয়েছে অভিযোগ।
শ্রমিক আন্দোলন আছে সব জায়গায়। ওয়াসা, ডেসা, বিদ্যুৎ বিভাগ, তিতাস গ্যাস, বিমান, প্রতিটি সেক্টরেই আছে সিবিএ বা কর্মচারি কল্যাণ সমিতি৷ অভিযোগ আছে, সিবিএ নেতারা প্রকৃতই শ্রমিক-কর্মচারীদের কল্যাণে যত না ব্যস্ত, তার চেয়ে বেশি ব্যস্ত নিজেদের আখের গোছাতে৷ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের সংগঠন এবং আন্দোলন এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত৷
২০০৬ সালের জুন মাসে পোশাক শ্রমিকরা বড় ধরনের আন্দোলনের মাধ্যমে প্রথম তাঁদের অধিকার নিয়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়৷ মাসিক মাত্র ১,৬৬২ টাকা ৫০ পয়সা মজুরি নির্ধারণের বিরুদ্ধে তাঁরা প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন৷ কোনো শ্রমিক সংগঠন ওই মজুরি মানেনি৷ তখন তাঁরা তিন হাজার টাকার ন্যূনতম মজুরির দাবিতে আন্দোলন করেন৷ সরকার রানা প্লাজা ধসের পর পাঁচ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করেন। এভাবে আন্দোলনের মাধ্যমে অতীতে শ্রমিকরা তাদের অধিকার ফিরে পেয়েছেন। কিন্তু এর প্রতিটি প্রভাব সরাসরি আমজনতার পকেটে পড়েছে। পোষাক শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় যখনই তাদের শ্রমের মুল্য বাড়িয়েছেন ঠিক তখনই তৈরী পোষাকের দাম হয়ে গেছে দ্বিগুন থেকে তিনগুন। আবার অন্যান্যখাতে একই কায়দায় একবার দাম বাড়লে আর কমে না। ফলে কিছুটা হলেও অধিকার পায় কৃষক, শ্রমিক কিন্তু সারবছরই ভোগান্তি পোহায় আমজনতা। এমন পরিস্থিতি মোকাবেলায় সিন্ডিকেটের জিম্মিদশা থেকে মুক্ত হওয়ার পদক্ষেপ জরুরি।
লেখক- সাংবাদিক
মোবাইল নং ০১৯১৬৯৫৭৪৯৪