মাহবুব আলম প্রিয়ঃ
অব্যাহতভাবে বেড়েই চলেছে
জ্বালানি গ্যাস ও বিদ্যুতের। এতে তীব্র সংকটে পড়েছে দরিদ্র জনগোষ্ঠী। তাই অতীতের মতো তাদের কাছে কদর বাড়ছে গোবর ঘুঁটের। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ গণের দাবী এ গোবরকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করলো বাড়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি। আর ঝুঁকি জেনেও গ্রামাঞ্চলের গৃহবধূদের কাছে রান্নার কাজে সাশ্রয়ী জ্বালানী হিসেবে গরুর গোবরের তৈরি লাকড়ির (ঘুঁটে) কদর দেখা গেছে।
সূত্র মতে, নারায়ণগঞ্জ রূপগঞ্জ উপজেলার বৈধ গ্যাস সংযোগকারী গ্রাহকের সংখ্যা সীমিত। আর অবৈধ গ্রাহক আর গ্যাস লাইনের আওতায় ছাড়া গ্রাহক ৬০ ভাগের বেশি। আবার আবাসন কোম্পানির বালি ফেলা আর শিল্পায়নের প্রভাবে এ অঞ্চলে দিন দিন কমে যাচ্ছে ফসলি জমি ও গাছপালা। তবে দরিদ্র পরিবারের যেসব লোকেরা এক সময় জ্বালানী হিসেবে লাকড়ী,গাছের পাতা ব্যবহার করতেন এখন তাদের অনেকেই নিজ পালের গরুর গোবরকে বিশেষ কায়দাশ শুকিয়ে জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করছেন।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, গোবরের মুইঠ্যা বা আটি হিসেবে পরিচিত এ জ্বালানী উপজেলার সর্বত্রই এটি চোখে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দা তানিয়া আক্তার মিনা বলেন, সময়ের আবর্তনে এখন বাড়ির পাশে গড়ে উঠা প্রাকৃতিক বন-জঙ্গল কেটে ফেলার কারনে জ্বালানী সংকট তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে ধনী ও বড় গৃহস্থ পরিবারের গৃহবধূরা ক্রয় করা খড়ি বা গ্যাস দিয়ে রান্না করতে পারলেও চরম বেকায়দায় পড়েছেন গরীব ও নিম্ন আয়ের পরিবারের বধূরা। তারা গ্যাস বা গাছের কাঠ-খড়ি ক্রয় করতে না পেরে গৃহপালিত গরুর গোবর দিয়ে লাকড়ি তৈরি করেন।আর তাদের তৈরি সেই লাকড়ি দিয়ে চলে সারাবছরের রান্নার কাজ।
উপজেলার ভোলাবো, গোলাকান্দাইল, দাউদপুর,রূপগঞ্জ সদর ও কায়েতপাড়া এলাকায় বাড়ির উঠানে, বাইরে খোলা জায়গায় বসে নারীদের গোবরের ঘুঁটে তৈরী করতে দেখা গেছে। পাতি বা কুলা ভর্তি গোবর, বালতি ভর্তি পানি, পাটখড়ি, ধইঞ্চা বা ধানের তুষ বা কুড়া ব্যবহার করে খালি হাতে ব্যবহার করতে দেখা যায়। এতে স্বাস্থ্য ঝুঁকি থাকলেও তারা সচেতন নয়।
স্থানীয় গৃহবধূ ফাতেমা বেগম বলেন, গোবরের সাথে মিশ্রিত করা হয় আংশিক পরিমাণের ধানের তুষ বা কুড়া।এরপর ২/৩ ফুট লম্বা পাটের শলা দিয়ে বধূরা তৈরি করেন লাকড়ি। গোবরের এসব তৈরি কাঁচা লাকড়িগুলো শুকানোর জন্য বাড়ির উঠানে আড় বেঁধে রোদে দাঁড় করে রাখা হয়। ২ থেকে ৩ দিন দিন পরই শুকিয়ে যায় লাকড়িগুলো। এভাবেই প্রতিদিনের তৈরি শুকনো লাকড়ি মজুদ রাখা হয় ঘরে।
উপজেলার ইছাখালীর গহবধু শাহিদা বলেন, গোবর দিয়ে তৈরি লাকড়ি এমন এক প্রকার জ্বালানি যা তৈরি করা খুবই সহজ। খরচ কম। উপকরণ হিসেবে প্রয়োজন গরু বা মহিষের গোবর।
স্থানীয় শিক্ষক দিদারুল ইসলাম মনু বলেন, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নারীরা বিকল্প জ্বালানি হিসেবে গোবর ব্যবহার করছেন। জ্বালানি সংকট থেকে বাঁচতে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের পরিবারের বধুরাও ঝুঁকছেন। তবে গরু লালন কম থাকায় গোবর পাওয়াও দায়।
এদিকে রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার আইভী ফেরদৌস বলেন,
জ্বালানি হিসেবে গোবরের ঘুঁটে ব্যবহার মৃত্যু ঝুঁকি বাড়ায়। যদি হাতে গ্লাভস বা নিরাপদ সরঞ্জাম ব্যবহার না করেন। তিনি বলেন, গোবর উৎকৃষ্ট সার তা জমিতে ব্যবহার করার কথা। কিন্তু ঘুঁটে ব্যবহার করে রান্না করে অনেকে। এতে তাদের চোখে সমস্যা হতে পারে। কারন হিসেবে তিনি বলেন, এসব গোবর সারের জ্বালানী ধোঁয়া সরাসরি প্রবেশ করে চোখে। চোখে লাগার সঙ্গে সঙ্গেই পানি বের হয় এবং চোখ ব্যথা করে। কারণ এ ধোঁয়াতে রয়েছে ক্ষতিকারণ মিথেন গ্যাস।
প্রতিনিয়ত গৃহিণীরা এ গোবরের তৈরি ঘুঁটে রান্নার কাজে ব্যবহার করলে একটা সময় তারা অন্ধ হয়ে যেতে পারেন। গ্রামের নারীদের বৃদ্ধাকালীন সময়ের অন্ধত্বের বড় কারণ হতে পারে। তিনি আরো বলেন, এ ধোঁয়া শ্বাস-প্রশ্বাস এবং লান্সের জন্য ক্ষতিকারক। হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়ায়। এছাড়া গোবরে ক্ষতিকারক আর্সেনিক রয়েছে। ধোঁয়ার মাধ্যমে সেই আর্সেনিক মানবদেহে প্রবেশ করে। যা কারণে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। এক কথায় জ্বালানি হিসেবে গোবর ঘুঁটে ব্যবহার মোটেও উচিৎ নয়।
রূপগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফাতেহা নূর বলেন, গোবর থেকে বায়োগ্যাস তৈরি করা যায়, যা জ্বালানি হিসেবে ভালো ভূমিকা রাখে। সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ভাবিত ভার্মি কমপোস্ট তৈরি করতেও গোবর অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপদান। জৈব সার হিসেবে এটি জমিতে ব্যবহারে ফসলের উৎপাদন কয়েকগুন বাড়ে। তাই ‘গোবরের ব্যবহার হবে জমিতে, চুলায় নয়। ’