প্রিয় বাবুল চৌধুরীকে অশ্রুজলে চিরবিদায় জানালো হাজার হাজার জনতা
কামরুল হাসান রাব্বিঃ
চাঁদপুর মতলব উত্তর উপজেলার জাতীয় স্বর্ণ পদকপ্রাপ্ত মোহনপুর ইউনিয়নের পাঁচবারের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব সামছুল হক চৌধুরী বাবুল এর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন সম্পন্ন হয়েছে। শুক্রবার সকালে মোহনপুর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ প্রাঙ্গনে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পুলিশের একটি চৌকস দল এই বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রতি গার্ড অব অনার প্রদান করেন। জানাজা শেষে বনানী কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করা হয়।
প্রশংশিত জনপ্রতিনিধি, দক্ষ সংগঠক ও আদর্শিক রাজনীতিবিদ, এলাকার প্রিয়মুখ বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব সামছুল হক চৌধুরী বাবুলকে অশ্রুজলে চিরবিদায় জানালো হাজার হাজার জনতা। এ দৃশ্য না দেখলে বুঝা যাবেনা। কি এক করুণ ও হৃদয়নিংড়ানো ভালবাসা জানানোর শেষ দৃশ্য। ভালোবাসা আর আবেগের কাছে মানুষের মন যে কতো অসহায় সামছুল হক চৌধুরী বাবুলের নামাজে জানাজার মাঠে সেটা উপলদ্ধি হয়েছে। সামছুল হক চৌধুরী বাবুল’কে চিরবিদায়ের সম্বর্ধনা জানানোর স্থান ছিল মতলব উত্তর উপজেলার দশানী মোহনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠ। ইসলামের পরিভাষায় যাকে বলা হয় নামাজে জানাজা।
শুক্রবার ১১ নভেম্বর বেলা প্রায় এগারোটা গড়াতেই শোকাহত, বিষন্ন হাজার হাজার মানুষের ঢল। মানুষের স্রোত যেন থামবার নয়। মানুষ আসছে আর আসছে। উপছে পড়া ভীড় ঠেলে তখনো অসংখ্য মানুষ তাদের প্রিয়জন সামছুল হক চৌধুরী বাবুলে’র নিথর নিষ্প্রাণ মুখটি শেষবারের মতো একটু দেখার জন্য পঙ্গপালের মতো ছুটে আসছিল। আর সবই বলছিল-হায় বাবুল চৌধুরী ! হায় বাবুল চৌধুরী ! জানাজা শুরু হওয়ার প্রায় আধাঘন্টা আগেই কানাই কানাই পূূর্ণ হয়ে যায় দশানী মোহনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের বিশাল মাঠ। কোথাও তিল পরিমান জায়গা নেই। জানাজায় অংশ নেয়া চাঁদপুর জেলার অনেকেই বলেছেন-সমসাময়িককালে এ অঞ্চলে এটা ছিল মানুষের উপস্থিতির দিক থেকে স্মরণকালের বৃহত্তম জানাজা।
পরোপকারী, সদা হাস্যউজ্জ্বল সামছুল হক চৌধুরী বাবুল হয়ত জীবদ্দশায় জানতেন না তাঁর এলাকার সহজ সরল মানুষগুলো তাঁকে নিজের অজান্তে কত বেশী ভালোবেসে ফেলেছে? তাঁর আদর্শিক কর্মীরা তাঁকে কতোনা অনুসরণ করেছে। মতলব উত্তর উপজেলার প্রতিটি এলাকা কোনায় কোনায় তাঁর পরিশ্রম, সরব পদচারণা ও উন্নয়নে দেয়া সময়ের ঘাম না শুকাতেই তিনি যে চির বিদায় নেবেন সেটা কেউ কল্পনাও করেননি। তাঁর প্রিয় জন্মক্ষেত্র মোহনপুর। সবাই মেনে নিতে পারছেননা বাবুল চৌধুরীর আকষ্মিক এই চলে যাওয়া। সবাই বলছিলেন, এই মানুষটির আমাদের বড় বেশী প্রয়োজন ছিল। কিন্তু মহান আল্লাহতায়লার কাছে বাবুল চৌধুরীকে নিয়ে যাওয়াটাকে আল্লাহ শ্রেয় মনে করেছেন, সেই বিশ্বাসে সবাই মেনে নিতে চাইলে আবেগী মনতো সেটা কোনভাবেই মানতে চায়না। বিশাল জানাজা প্রমান করেছে বীর মুক্তিযোদ্ধা সামছুল হক চৌধুরী বাবুল কতো বেশী জনপ্রিয়, সংগঠক ও জনবান্ধব মানুষ ছিলেন।
শুক্রবার ১১ নভেম্বর ১১ টায় অনুষ্ঠিত বিশাল এই নামাজে জানাজায় ইমামতি করেন আল্লামা শায়েখ সায়্যিদ মাসউদ আহমাদ বোরহানী। জানাজার পূর্বে সামছুল হক চৌধুরী বাবুলে’র বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের স্মৃতিচারণ করে মুঠোফোনে বক্তৃতা করেন বাবুল চৌধুরীর চাচাতো ভাই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম, চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. নাছির উদ্দিন আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু নঈম পাটওয়ারী দুলাল, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের কার্যকারী কমিটির সদস্য সাজেদুল হোসেন চৌধুরী দিপু, চাঁদপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব ওচমান পাটওয়ারী, সাবেক জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এমএ ওয়াদুদ, মতলব উত্তর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এ্যাড. রুুহুল আমিন, সাধারণ সম্পাদক এমএ কুদ্দুছ, ফরিদগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম রোমান, উপজেলা আ’লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান (এসি মিজান), সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর মাস্টার, সাবেক উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোজাম্মেল হক, ইউপি চেয়ারম্যান আজমল চৌধুরী। বহুগুনে গুনান্বিত বাবুল চৌধুরীর বর্ণাঢ্য জীবনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বক্তা ও শ্রোতারা সকলেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।
এসময় জানাজার ময়দানে এক হৃদয় বিদারক করুণ দৃশ্যের অবতারণা হয়। বক্তারা মরহুমকে একজন নির্লোভ ও ত্যাগী সমাজকর্মী হিসাবে মূল্যায়ন পূর্বক তাঁর অবদান সবার কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে উল্লেখ করে বলেন-বাবুল চৌধুরীরর আকস্মিক চলে যাওয়া আমাদের সকলের জন্য অপূূরণীয় ক্ষতি। যে শূন্যতা সহজে পূরণ হবার নয়। নামাজে জানাজা শেষে পিতার কবরের পাশে বনানী কবরস্থানে সবার অশ্রুজলে বাবুল চৌধুরী’কে চিরনিদ্র্রায় শায়িত করা হয়। বিদায়, চির বিদায় হে গণমানুষের হৃদয়ের মনিকোটায় স্থান করে নেয়া বেড়িবাঁধ বেস্টিত এলকায় ক্ষণজম্মা সামছুল হক চৌধুরী বাবুল। চিরনিদ্রায় ভাল থেকো আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় বাবুল চৌধুরী। শেষ বিচারের দিনে দেখা হবে হে আল্লাহতালার প্রিয় বান্দা আপনার সাথে। মহান আল্লাহ রাব্বুলআলামিন বাবুল চৌধুরী’র বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন কবুল করে নিয়ে জান্নাতুল ফেরদৌসে স্থায়ী ঠিকানা করে দিন। আমিন! চুম্মা আমিন।
উল্লেখ্য, সামছুল হক চৌধুরী বাবুল অত্র উপজেলার শিক্ষার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে গেছেন। তিনি উপজেলার দশানী মোহনপুর উচ্চ বিদ্যালয়, মাথাভাঙ্গা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়’সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীদের পড়াশুনার ব্যয়বহন করতেন তিনি।
এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকার ল্যাব এইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বৎসর। তিনি স্ত্রী, ২ ছেলে ও ২ মেয়েসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।