মাদক কারবারিদের দৌড়াত্ম্যে নিরাপত্তাহীনতায় এলাকাবাসী
মাহবুব আলম প্রিয়ঃ
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কায়েতপাড়া ইউনিয়নের চনপাড়া পুনবার্সন কেন্দ্রের ২৬ একর জমিতে ছোট ছোট ঘরে লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। বিভিন্ন অঞ্চলের মাদক কারবারি, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, ডাকাত ও ভাড়াটে খুনিরা এখানে আস্তানা করেছে বহুবছর ধরে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলাকাবাসী জানায়, চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্রে দুই শতাধিক মাদকের ডিলার রয়েছে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় বস্তিতে মাদকের হাট বসে। পুলিশ,মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ প্রশাসনের নিয়োজিত এক ধরনের অসাধু প্রতিনিধিরা সুবিধা নেয় বলে রয়েছে অভিযোগ। এলাকাটি ঢাকা জেলার ডেমরা থানার বালু নদীর পূর্বপাড়ে থাকায় সহজেই রাজধানীর মাদকসেবীরা এখানে চলে আসতে পারে। নারায়ণগঞ্জের সদর, সিদ্ধিরগঞ্জ, ঢাকার ডেমরা, রামপুরা, যাত্রাবাড়ী, সবুজবাগ থানাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ এখানে মাদক সেবন করতে আসে। দিন দিন মাদকের ব্যবসা ও সেবনের প্রসার ঘটছে। এতে চরম আতঙ্কে রয়েছেন এলাকাবাসি৷
সম্প্রতি গত ৪ নভেম্বর নিখোঁজ হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী ফারদিন নুর পরশ। ৭ নভেম্বর শীতলক্ষ্যা নদীতে তার লাশ পাওয়া যায়। ময়নাতদন্ত করা চিকিৎসক, তার পরিবার ও সহপাঠীদের দাবি, ফারদিনকে হত্যা করা হয়েছে। শরীরে আঘাতের চিহ্নও পাওয়া গেছে। এর আগে, রূপগঞ্জের চনপাড়া বস্তিতে বন্দুকযুদ্ধে’ শাহীন নামের (সিটি শাহীন নামে পরিচিত) যে ব্যক্তি নিহত হয়েছে তার বিরুদ্ধে ছিল ২৩টি মামলা। তিনি চনপাড়া এলাকার সাত নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় দুটি ও ছয় নম্বর ওয়ার্ড এলাকার একটি মাদক বেচাকেনার কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ করতো বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসি । ইউনিয়ন পরিষদের নয় নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ও উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরী সদস্য বজলুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন তিনি। ১০ নভেম্বর বৃহস্পতিবার দুপুরে র্যাব-১ এর একটি দল অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার অভিযানে গেলে এই বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে। এতে র্যাবের অন্তত পাঁচ সদস্য আহত হয়েছেন।
এই ঘটনায় শুক্রবার সকালে র্যাব-১ এর পরিদর্শক মো. আশরাফুজ্জামান বাদী হয়ে রূপগঞ্জ থানায় একটি মামলা করেন। সেখানে অজ্ঞাতপরিচয় ‘মাদক ব্যবসায়ীদের’ আসামি করা হয়।এ ছাড়া একই ঘটনায় অস্ত্র ও মাদক উদ্ধারের বিষয়ে র্যাবের পরিদর্শক আশরাফুজ্জামান আরও দুটি মামলা করেছেন।আশরাফুজ্জামান বলেন, বৃহস্পতিবার দুপুর দেড়টার দিকে মাদকের বড় চালান ক্রয়-বিক্রয়ের খবর পেয়ে চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্রের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বালুর মাঠে যায় র্যাবের একটি দল। মাদক ব্যবসায়ীরা র্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে র্যাব গুলি চালায়। সেই সাথে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। আত্মরক্ষার্থে র্যাব পাল্টা গুলি ছোড়ে। প্রায় ১০-১৫ মিনিট উভয়পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি চলে। গোলাগুলি চলাকালে মাদক ব্যবসায়ীদের ধাওয়া দেওয়ার সময় র্যাবের কয়েকজন সদস্য আহত হন। অভিযান শেষে ফেরার পথেও ‘দুষ্কৃতকারীরা’ ইট-পাটকেল ছুড়তে থাকে; তখন র্যাব সদস্যরা কৌশলে রক্ষা পান বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে। স্থানীয় লোকজন ও রূপগঞ্জ থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে তাদের উপস্থিতিতে দুপুর ২টার দিকে বালুর মাঠের মাঝখানে মাদক ব্যবসায়ী শাহীনকে উপুড় হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। অজ্ঞাতনামা মাদক ব্যবসায়ীদের এলোপাতাড়ি গুলিতে শাহীন আহত হয়। তাকে উদ্ধার করে মুগদা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ৪টা বেজে ২০ মিনিটে তিনি মারা যান। আহত অবস্থায় পড়ে থাকা শাহীনের পাশ থেকে ৮ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের একটি বিদেশি পিস্তল, তিনটি গুলিসহ ম্যাগাজিন, পাশে দুটি গুলির খোসা পাওয়া যায়। দুটি জিপার প্যাকেটের ভেতর ৪৫ গ্রাম হেরোইনও উদ্ধার করা হয়।
এদিকে মাদকের ‘অভয়ারণ্য’ চনপাড়ায় গত ৫০ বছরে ২০ খুনের ঘটনা রয়েছে।
ফলে নানা কারনে,সারা বছর আলোচনায় থাকে নারায়ণগঞ্জ জেলার এ অপরাধ জোন চনপাড়া। যে পাড়াকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে মাদকের ‘অভয়ারণ্য’। মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এসব ঘটনা ঘটে। তবে সম্প্রতি বুয়েট ছাত্র ফারদিন নূর পরশ খুনের ঘটনার পর আবারও ‘চনপাড়া’ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে।
সূত্র জানায়,, চনপাড়ায় পুর্নবাসনের জন্য আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল ঘরহীন মানুষদের। কিন্তু সেই বস্তি এখন নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। চনপাড়ায় বাস করেন এমন কয়েক শতাধিক মানুষ মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত। কেউ সরাসরি, কেউবা নেপথ্যে কাজ করেন। প্রতিদিন চনপাড়ায় লাখ লাখ টাকার মাদক বিক্রি হয়। এর মধ্যে গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন অন্যতম। বিভিন্ন সময় পুলিশ অভিযান চালালেও মূল হোতারা বরাবরই থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
নারায়ণগঞ্জ পুলিশের একটি সূত্র জানায়, মাদকের ‘অভয়ারণ্য’ বলে খ্যাত এই বস্তিটিতে প্রায় দেড় লক্ষাধিক মানুষের বাস। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এই বস্তিতে অভিযান চালাতে গিয়ে প্রায়ই হিমশিম খেতে হয়। বেশিরভাগ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা করে বসে মাদক ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয়রা জানায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালাবে- এমন খবর আগেই পেয়ে যায় মাদক ব্যবসায়ীরা এবং তারা অস্ত্র ও লাঠিসোটা নিয়ে প্রস্তুত থাকে।
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী ও এডুকেশন সোসাইটির সভাপতি নুর আলম মুন বলেন, চনপাড়ায় শিক্ষিত ও কর্মজীবি মানুষের সংখ্যা বেশি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে
মাদককারীরা সক্রিয়। তারা নদী পথে বিশেষ করে নৌকায় রাতের বেলাকেই নিরাপদ সময় মনে করেন মাদক ব্যবসায়ীরা। এই বস্তির বেশিরভাগ মাদক ব্যবসায়ীর নিজস্ব নৌকা রয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মাদক ব্যবসার গডফাদার হিসেবে কাজ করেন বজলু মেম্বার। তার সহযোগী হিসেবে কাজ করতো সিটি শাহীন। শাহীন সম্প্রতি বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। তাদের একটি গ্রুপ আছে। যারা পুরো বস্তির মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন এবং মাদক ব্যবসার চাঁদা তোলেন।
এছাড়াও এ বস্তিতে মাদকের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন তাদের মধ্যে অন্যতম রায়হান, পিচ্চি শাহ আলম, মিঠু, জয়নাল, শাওন, রবিন ডাকাত, মোস্তফা,ভাগিনা মোবারক, মাল্টা রনিসহ একটি সন্ত্রাসীমহল।
তবে প্রাণভয়ে কেউ এ সক্রিয় প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে মুখ খুলেন না। এমনকি ভুক্তভোগী হলেও তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার সাহস পায় না।
চনপাড়া শেখ রাসেল নগর ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, এখানে যারা বসবাস করি সবাই খারাপ নয়, তবে খারাপ মানুষের সংখ্যা কম। বহুবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়েছে কিন্তু মাদক কারবারিদের কিছুই করতে পারেনি। এখানে যত মারামারি কাটাকাটি হয় সবটাতে মাদক কারবারিদের এক গ্রুপের বিরুদ্ধে অপর গ্রুপ লেগে থাকে। ফলে সাধারণ লোকজন চরম নিরাপত্তাহীনতায় থাকেন।
রূপগঞ্জ থানা পুলিশ জানায়, ইউপি সদস্য বিউটি আক্তার কুট্টি চনপাড়া থেকে চনপাড়া কায়েতপাড়া গাজী বাইপাস সড়কে দিয়ে পশ্চিমগাঁও এলাকার দিকে হাটতে বের হয়। বুধবার ভোরে বিউটি আক্তার কুট্টি পশ্চিমগাঁও এলাকায় পৌছাঁলে একদল দূর্বৃত্ত আগে থেকে ওৎ পেতে থাকা তার উপর হামলা চালিয়ে তাকে এলোপাথারিভাবে কুপিয়ে তাকে হত্যা করে। এ ঘটনায় নিহতের মেয়ে পারভীন আক্তার বাদী হয়ে বুধবার রাতে চনপাড়া এলাকার স্বপন, জয়নাল, শমসের, খলিল, রবিন, কুদ্দুস, রাজা, সিটি শাহিন, খাজা, আনোয়ার, জামালসহ ১১জন নামীয় ও আরো অজ্ঞাতনামা ৫/৬ জনকে আসামী করে রূপগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
এর আগে নিহত বিউটি আক্তার কুট্রির স্বামী হাসান মুহুরীকেও সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনায় বিউটি আক্তার কুট্রি বাদী হয়ে রূপগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলার আসামীরা জেল থেকে জামিনে বের হয়ে মামলার বাদী বিউটি আক্তার কুট্টিকে বিভিন্ন সময় হুমকি দিতো। নিহতের স্বামীর হত্যাকারীরাই ইউপি সদস্যকে কুপিয়ে হত্যা করেছে।
এদিকে এমন রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাববিস্তারকে কেন্দ্র করে ঘটানো একেক খুন আর বাড়ি ঘরে হামলা লুটের ঘটনায় অশান্ত পরিবেশ থাকে সারা বছর। ফলে স্থানীয় সুশীল সমাজ, শিক্ষার্থী ও কর্মজীবি মানুষরা থাকেন চরম নিরাপত্তাহীনতায়। তবে এমন সব ঘটনার পর স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আলহাজ্ব জায়েদ আলীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, চনপাড়া নিয়ে মন্তব্য বা বক্তব্য দেয়ার কিছু নাই। তবে মাদকের সঙ্গে জড়িতরা অশান্ত পরিবেশ তৈরী করে। যা আইনশৃঙ্খলা বাহীনি জানে। তারা এসব দেখবে। এসব বিষয়ে রূপগঞ্জ থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি এএফএম সায়েদ বলেন, আইন শৃঙ্খলা বাহীনি সব সময় মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এখনো তাই। যারা বিশৃঙ্খলা করবে তাদের বিরুদ্ধে রূপগঞ্জ থানা পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত।