শিরোনাম:
চাঁদপুরে নতুন কুঁড়ির ৩ যুগ পূর্তি উপলক্ষে মেহেদি উৎসবের প্রস্তুতি সভা চাঁদপুরে মাদকসহ গ্রেফতার ১১, কিশোর গ্যাং সন্দেহে আটক ৭৬ চাঁদপুরে কোস্টগার্ডের অভিযানে সাড়ে ৪ লাখ মিটার কারেন্ট জাল জব্দ, আটক ৫২ জেলে চাঁদপুর শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসারকে ঘিরে ক্ষোভ, তদন্ত ও বদলির দাবি সংস্কৃতিকর্মীদের মতলব দক্ষিণে দুর্যোগ প্রশমন দিবস-২০২৬ পালিত মতলব উত্তরের ইন্দুরিয়া বেগম খালেদা জিয়া স্মরণে মিনিবার টিভি কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট উদ্বোধন চাঁদপুরে দোকান ভাড়ার বিরোধে ব্যবসায়ী কাজী হুমায়ুন আটক মতলব উত্তরে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস পালিত চাঁদপুরে ঠোঁটকাটা-তালুকাটা রোগীদের বিনামূল্যে অস্ত্রোপচার শুরু মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি ও মূল্য তালিকা না থাকায় চাঁদপুরে ৪ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা

চাঁদপুর শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসারকে ঘিরে ক্ষোভ, তদন্ত ও বদলির দাবি সংস্কৃতিকর্মীদের

reporter / ১২ ভিউ
আপডেট : বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

মহড়াকক্ষ ব্যবহারে বিধিনিষেধ, সাংস্কৃতিক আয়োজনে অনুপস্থিতি ও প্রশিক্ষক বাদ দেওয়াসহ নানা অভিযোগ; অভিযোগ অস্বীকার করে নিজের বক্তব্য দিয়েছেন দিতি সাহা

বিশেষ প্রতিনিধিঃ

চাঁদপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার দিতি সাহার দায়িত্ব পালন, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা, মহড়াকক্ষ ব্যবহারের সুযোগ এবং প্রশিক্ষক বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন জেলার নাট্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একাংশের কর্মীরা। এসব বিষয়ে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। একই সঙ্গে দিতি সাহাকে চাঁদপুর থেকে অন্যত্র বদলি করে তাঁর স্থলে সংস্কৃতিকর্মীবান্ধব কর্মকর্তা পদায়নের দাবিও উঠেছে।

চাঁদপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমি জেলার নাটক, সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি, চিত্রকলা ও অন্যান্য সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। জেলার শিল্পী, নাট্যকর্মী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর নিয়মিত চর্চা এবং সাংস্কৃতিক বিকাশে প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান কার্যক্রম ও সেবা নিয়ে সংস্কৃতিকর্মীদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

সাংস্কৃতিক আয়োজনে উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন

সংস্কৃতিকর্মীদের অভিযোগ, জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার হিসেবে দিতি সাহার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা প্রত্যাশিত মাত্রায় দৃশ্যমান নয়। জেলার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের অনুষ্ঠান, নাটকের মহড়া ও অন্যান্য আয়োজনে তাঁকে নিয়মিত উপস্থিত থাকতে দেখা যায় না বলে দাবি তাঁদের।

সম্প্রতি চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ মানিকের উদ্যোগে জেলা বিএনপির আয়োজনে ১৪ দিনব্যাপী ‘মেইড ইন চাঁদপুর কালচারাল ফেস্টিভ্যাল’ অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া চাঁদপুর থিয়েটার ফোরামের আয়োজনে ১০ দিনব্যাপী নাট্যোৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এসব আয়োজনে কালচারাল অফিসার দিতি সাহার উপস্থিতি ও ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংস্কৃতিকর্মীদের কেউ কেউ।

তাঁদের দাবি, জেলার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন কর্মকর্তার গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক আয়োজনগুলোতে অংশগ্রহণ ও সমন্বয়ের বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

এ বিষয়ে দিতি সাহার কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি থেকে যেসব অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়, সেসব অনুষ্ঠানে তাঁদের থাকতে হয়। তবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার বাধ্যবাধকতা নেই।

১৪ দিনব্যাপী ‘মেইড ইন চাঁদপুর কালচারাল ফেস্টিভ্যাল’ এবং চাঁদপুর থিয়েটার ফোরামের ১০ দিনব্যাপী নাট্যোৎসবে তিনি কত দিন উপস্থিত ছিলেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি।

মহড়াকক্ষ ব্যবহারে বিধিনিষেধের অভিযোগ

জেলা শিল্পকলা একাডেমির মহড়াকক্ষ ব্যবহারের সুযোগ নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে কয়েকটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীদের মধ্যে। তাঁদের অভিযোগ, দিতি সাহা চাঁদপুরে যোগদানের পর থেকে বিভিন্ন নাট্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নিয়মিত মহড়া ও রিহার্সালের জন্য আগের মতো সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে না। এতে সাংস্কৃতিক চর্চা ব্যাহত হচ্ছে বলে দাবি তাঁদের।

বিশেষ করে রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের মহড়া ও কক্ষ ব্যবহারের সময়সূচি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ। তাঁদের বক্তব্য, কোনো সংগঠন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কক্ষ ভাড়া নিলে তার আগের দিন মহড়ার সুযোগ কীভাবে দেওয়া হয়, সে বিষয়ে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে কালচারাল অফিসার দিতি সাহা বলেন, “আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যার কারণে সবাইকে এখানে মহড়া করার সুযোগ দিতে পারিনি। যারা মহড়া করে, তারা জেলা প্রশাসক স্যারের অনুমতি ও ভাড়া সাপেক্ষে করে থাকেন।”

সংস্কৃতিকর্মীদের দাবি, মহড়াকক্ষ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সব সংগঠনের জন্য অভিন্ন নীতিমালা, স্বচ্ছ সময়সূচি ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

অনুদানের আবেদনে স্বাক্ষর নিয়ে ভোগান্তির অভিযোগ

সম্প্রতি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সাংস্কৃতিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনুদানের আবেদনসংক্রান্ত কাজে জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে গিয়ে কালচারাল অফিসারের স্বাক্ষর নিতে ভোগান্তিতে পড়ার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সংস্কৃতিকর্মী।

তাঁদের অভিযোগ, ওই দিন সকাল ১০টা থেকে কয়েকজন আবেদনকারী স্বাক্ষরের জন্য অপেক্ষা করেন। পরে বেলা ১২টার দিকে কালচারাল অফিসার উপস্থিত হলে তাঁরা স্বাক্ষরের জন্য তাঁর কাছে যান। কিন্তু তাঁর অফিসিয়াল সিল সঙ্গে না থাকায় কয়েকজনকে ফিরে যেতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, সিলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি উত্তেজিত প্রতিক্রিয়া জানান। এ ছাড়া স্বাক্ষরসংক্রান্ত কাজে দুই থেকে তিন দিন ধরে ভোগান্তির শিকার হওয়ার কথাও জানিয়েছেন কয়েকজন সংস্কৃতিকর্মী।

তবে এ ঘটনায় কতজন আবেদনকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং পরবর্তী সময়ে তাঁদের আবেদনসংক্রান্ত কাজ সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সরকারি অনুদানের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে আবেদনকারীদের যথাসময়ে সহযোগিতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রশিক্ষক বাদ দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন

জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে আগে দায়িত্ব পালন করা কয়েকজন তবলা ও নৃত্য প্রশিক্ষককে বাদ দেওয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংস্কৃতিকর্মীদের কেউ কেউ। তাঁদের অভিযোগ, প্রশিক্ষক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়েছে কি না, তা পরিষ্কার নয়। কেউ কেউ এ ঘটনায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগও তুলেছেন।

এ বিষয়ে দিতি সাহা বলেন, এক বছরের চুক্তির ভিত্তিতে প্রশিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল এবং সেই চুক্তির ভিত্তিতেই তাঁদের বাদ দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া ও সিদ্ধান্তের বিষয়টিও রয়েছে বলে তিনি জানান।

তবে প্রশিক্ষকদের চুক্তির মেয়াদ, বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং নতুন প্রশিক্ষক নির্বাচনের ক্ষেত্রে অনুসরণ করা নীতিমালা সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা যাচাই ছাড়া কোনো অনিয়ম বা স্বজনপ্রীতির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়।

একই কর্মস্থলে প্রায় তিন বছর আট মাস

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কালচারাল অফিসার দিতি সাহা ২০২৩ সালের ২৯ জানুয়ারি চাঁদপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে যোগদান করেন। সে হিসাবে ২০২৬ সালের অক্টোবরে তাঁর চাঁদপুরে কর্মকাল প্রায় তিন বছর আট মাস।

একই জেলায় একজন সরকারি কর্মকর্তা সর্বোচ্চ কত বছর দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সে বিষয়ে প্রযোজ্য বদলি ও পদায়ন নীতিমালা পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন সংস্কৃতিকর্মীদের কেউ কেউ। তবে নির্দিষ্ট সময়ের বেশি একই কর্মস্থলে থাকলেই তা বিধিবহির্ভূত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট বিধিমালা যাচাই করা প্রয়োজন।

অভিযোগের বিষয়ে দিতি সাহার বক্তব্য

নিজের দায়িত্ব ও ভূমিকা নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে দিতি সাহা বলেন, “আমার দায়িত্ব ও ভূমিকা নিয়ে যেভাবে কথাগুলো প্রকাশ হয়েছে, বিষয়টি সে রকম নয়।”

মহড়াকক্ষ ব্যবহারের বিষয়ে তিনি একাডেমির সীমাবদ্ধতা এবং জেলা প্রশাসকের অনুমতি ও ভাড়ার শর্তের কথা উল্লেখ করেন। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার বিষয়ে তিনি জানান, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে হয়; ব্যক্তিগত উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার বাধ্যবাধকতা নেই।

তবে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনে তাঁর উপস্থিতি, মহড়াকক্ষ ব্যবহারের নীতিমালা, প্রশিক্ষক বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া এবং অনুদানের আবেদনে স্বাক্ষরসংক্রান্ত অভিযোগগুলোর বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে।

নিরপেক্ষ তদন্ত ও বদলির দাবি

চাঁদপুরের নাট্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একাংশের কর্মীদের দাবি, জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসারের দায়িত্ব পালন, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা, মহড়াকক্ষ ব্যবহারের সুযোগ, প্রশিক্ষক নিয়োগ ও বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া এবং অনুদানসংক্রান্ত সেবা নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক।

তাঁদের মতে, শিল্পকলা একাডেমি জেলার সব সাংস্কৃতিক সংগঠন ও শিল্পীর জন্য উন্মুক্ত, সহযোগিতামূলক এবং কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন। এ জন্য মহড়াকক্ষ ব্যবহারের সুস্পষ্ট নীতিমালা, প্রশিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা, সেবাগ্রহীতাদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি।

সংস্কৃতিকর্মীদের একটি অংশ অভিযোগগুলোর যথাযথ তদন্ত সাপেক্ষে দিতি সাহাকে চাঁদপুর থেকে অন্যত্র বদলি করে তাঁর স্থলে দক্ষ, অভিজ্ঞ ও সংস্কৃতিবান্ধব কর্মকর্তা পদায়নের দাবি জানিয়েছেন।

তাঁদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। একই সঙ্গে জেলা শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।


এই বিভাগের আরও খবর