শিরোনাম:
মতলব উত্তরে ডাকাতি মামলার আসামি’সহ গ্রেপ্তার ৩ ১০ সন্তান থেকেও আশ্রয়ের অনিশ্চয়তায় ৮০ বছরের জয়নব, দুই মাসের ব্যবস্থা করলেন ইউএনও জমি দখলের অভিযোগ অস্বীকার, অপপ্রচারের প্রতিবাদে জামায়াত নেতার পক্ষে সংবাদ সম্মেলন মতলবে উত্তর বাইশপুর গণ কবরস্থানের কমিটি গঠন শাহরাস্তির কাদরায় ৬ ছেলের ঘরে ঠাঁই হলো না ৮৫ বছরের বৃদ্ধ মায়ের মতলব উত্তরে যুবলীগ নেতা ও এনজিও কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার, আটক ৮ কিশোর মতলবে কলেজ শিক্ষকের স্ত্রীর রহস্যজনক মৃত্যু, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য স্বামী আটক মতলব উত্তরে পুলিশের বিশেষ অভিযান: মাদক ও পরোয়ানার ৭ আসামি গ্রেপ্তার দুর্গাপূজায় শুভেচ্ছা জানিয়েছে বিএনপি নেতা তানভীর হুদা প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ও ছাত্রঅধিকার পরিষদ নেতার আন্তরিক সহযোগিতায় দেশে আসলো সৌদি প্রবাসীর মৃতদেহ

১০ সন্তান থেকেও আশ্রয়ের অনিশ্চয়তায় ৮০ বছরের জয়নব, দুই মাসের ব্যবস্থা করলেন ইউএনও

reporter / ৩৫ ভিউ
আপডেট : মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬

‘মরহুম স্বামীর ভিটা ছেড়ে কোথাও যেতে চাই না’—ছেলের বাড়িতে সাময়িক আশ্রয়, স্থায়ী আবাসনের অপেক্ষায় বৃদ্ধা

মোসাদ্দেক হোসেন জুয়েল :
ছয় ছেলে ও চার মেয়েসহ ১০ সন্তানের মা জয়নব বানু। বয়স ৮০ বছর। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁর চাওয়া খুব বেশি নয়—মরহুম স্বামীর রেখে যাওয়া ভিটায় একটি ছোট ঘরে নিরাপদে বসবাস করা। কিন্তু ১০ সন্তান থাকা সত্ত্বেও নিজের স্থায়ী আশ্রয় নিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাঁর। বিষয়টি জানার পর শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিরা খাতুনের উদ্যোগে আপাতত দুই মাসের জন্য ছেলের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। তবে সাময়িক এই আশ্রয়ের পর কোথায় থাকবেন, তা নিয়ে এখনো দুশ্চিন্তায় রয়েছেন বৃদ্ধা।
‘আমি আমার মরহুম স্বামীর ভিটা ছেড়ে কোথাও যেতে চাই না। ছেলেরা আমার স্বামীর রেখে যাওয়া জমিতে একটি দুচালা ঘর করে দিলে সেখানেই থাকব।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিজের আকাঙ্ক্ষার কথা এভাবেই তুলে ধরেন জয়নব বানু।
চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার চিতোষী পূর্ব ইউনিয়নের কাদরা পূর্বপাড়ার সৈয়দ আহম্মেদের বাড়ির বাসিন্দা তিনি। তাঁর স্বামী সৈয়দ আহম্মেদ ১৯৯৮ সালে মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তানদের লালন-পালন ও সংসারের দায়িত্ব সামলে জীবনের দীর্ঘ সময় পার করেছেন জয়নব। অথচ বার্ধক্যে এসে নিজের থাকার জায়গা নিয়েই তাঁকে অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হয়েছে।
ছেলের ঘরের দরজায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার বাড়িতে ফিরে ছেলে মনির হোসেনের ঘরের দরজায় সকাল সাড়ে ১১টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত বসে ছিলেন জয়নব বানু। সেখানে তাঁর থাকার ব্যবস্থা না হওয়ায় একপর্যায়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় ঘোরাফেরা করতে থাকেন তিনি।
এ সময় এক পথচারী তাঁর পরিচয় ও বাড়ির ঠিকানা জানতে চান। পরে ওই ব্যক্তি তাঁকে একই গ্রামের বাসিন্দা ঝরণা খাতুনের বাড়িতে পৌঁছে দেন। সেখানে চার দিন অবস্থান করেন বৃদ্ধা।
পাশে দাঁড়ালেন ইউএনও মনিরা খাতুন
বিষয়টি জানার পর জয়নব বানুর পাশে দাঁড়ান শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিরা খাতুন। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুপুর ১২টার দিকে তিনি ঝরণা খাতুনের বাড়ি থেকে বৃদ্ধাকে নিয়ে তাঁর ছেলে আনোয়ার হোসেনের বাড়িতে যান। আনোয়ার হোসেন সৌদি আরবপ্রবাসী। তাঁর স্ত্রী হাজেরা বেগমের তত্ত্বাবধানে আপাতত দুই মাসের জন্য জয়নব বানুর থাকার ব্যবস্থা করে দেন ইউএনও।
এতে সাময়িকভাবে আশ্রয়ের’ ব্যবস্থা হলেও বৃদ্ধার দীর্ঘমেয়াদি আবাসন সমস্যার সমাধান হয়নি। দুই মাস পর তাঁকে কোথায় থাকতে হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। তাঁর একান্ত চাওয়া, স্বামীর রেখে যাওয়া ভিটায় একটি ছোট ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হোক, যাতে জীবনের শেষ দিনগুলো পরিচিত পরিবেশে কাটাতে পারেন।
ছয় ছেলে ও চার মেয়ের মা জয়নব
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, জয়নব বানুর ছয় ছেলের মধ্যে বড় ছেলে শাহাজাহান শারীরিক প্রতিবন্ধী। দ্বিতীয় ছেলে আবুল কাসেম দেশে ট্রাক চালান। তৃতীয় ছেলে আনোয়ার হোসেন, চতুর্থ ছেলে আনিছুর রহমান, পঞ্চম ছেলে মনির হোসেন ও ষষ্ঠ ছেলে ঈমাম হোসেন সৌদি আরবপ্রবাসী। তাঁদের মধ্যে একজন শারীরিক অসুস্থতার কারণে বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন বলে জানা গেছে।
চার মেয়ের মধ্যে পেয়ারা খাতুন মনোহরগঞ্জে স্বামীর বাড়িতে থাকেন। অন্য মেয়েদের মধ্যে ঝরণা খাতুনসহ কয়েকজন একই এলাকার বাসিন্দা।
জয়নব বানুর জীবনে রয়েছে স্বামীকে হারানোর বেদনাদায়ক স্মৃতিও। তাঁর ছোট ছেলে ঈমাম হোসেন মায়ের গর্ভে সাত মাসের থাকতেই স্বামী সৈয়দ আহম্মেদ মারা যান। এরপর সন্তানদের লালন-পালন করে বড় করেছেন তিনি। সন্তানদের জীবন গড়ে ওঠার পর বার্ধক্যে এসে নিজের আশ্রয় নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ার বিষয়টি তাঁকে কষ্ট দিচ্ছে।
স্থায়ী আবাসনের সমাধান চান স্থানীয়রা
এ বিষয়ে পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বৃদ্ধার স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা না হওয়ার কারণ, স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে তাঁর বসবাসের অধিকার এবং পারিবারিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাই এ ঘটনায় কোনো ব্যক্তির দায় সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
তবে বার্ধক্যে একজন মানুষের নিরাপদ আশ্রয়, প্রয়োজনীয় পরিচর্যা ও সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জয়নব বানুর ক্ষেত্রে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার উদ্যোগে আপাতত দুই মাসের আশ্রয় মিললেও স্থায়ী সমাধান এখনো বাকি। এ ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের দায়িত্বশীল ভূমিকা, সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিষয়গুলোর যথাযথ সমাধান এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন।
একজন মায়ের কাছে শেষ বয়সের চাওয়া হয়তো খুব বেশি কিছু নয়—একটু নিরাপদ আশ্রয়, পরিচিত ভিটায় থাকার সুযোগ আর সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। জয়নব বানুর আকুতি তাই শুধু একজন বৃদ্ধার ব্যক্তিগত দুর্দশার গল্প নয়; এটি প্রবীণদের প্রতি পারিবারিক দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার প্রশ্নও সামনে এনেছে।
দুই মাসের সাময়িক আশ্রয়ের পর ৮০ বছরের জয়নব বানুর কী হবে? স্বামীর রেখে যাওয়া ভিটায় ছোট্ট একটি ঘরে বসবাসের তাঁর স্বপ্ন পূরণ হবে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।


এই বিভাগের আরও খবর