শিরোনাম:
অসহায় ও দরিদ্র শীতার্তদের মাঝে ছাত্র হিযবুল্লাহর শীতবস্ত্র বিতরণ শিক্ষার্থী বৃদ্ধি ও শিক্ষার মানোন্নয়নে ঘাসিরচরে সম্মিলিত প্রচেষ্টা মতলব উত্তরে শীতার্তদের পাশে ‘নবজাগরণ ঐক্য ফাউন্ডেশন’ মতলবে পাওনা টাকাকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে জখম, মালামাল লুট মতলব দক্ষিণে পরিত্যক্ত রান্নাঘর থেকে মরদেহ উদ্ধার মতলব উত্তরে খেলাফত মজলিসের বিক্ষোভ মিছিল মতলব দক্ষিণে ভেটেরিনারি ফার্মেসীগুলোতে অভিযান, চাঁদপুরে সম্পত্তিগত বিরোধ : হাতুড়ির আঘাতে বড় ভাইয়ের মৃত্যু মতলবে সরকারি গাছ নিধন: বনবিভাগ-এলজিইডির দোষারোপে জনরোষ মতলব উত্তরে নিশ্চিন্তপুর ডিগ্রি কলেজে একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নবীনবরণ অনুষ্ঠিত

অতিদরিদ্রদের জন্য আত্মকর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি) চাঁদপুরে অভিনব কৌশলে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

reporter / ২৮৫ ভিউ
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ২১ জুলাই, ২০২২

বেলায়েত সুমনঃ
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন অতিদরিদ্রদের জন্য আত্মকর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি) প্রকল্পে অভিনব কৌশলে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে চাঁদপুর জেলার আট উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের কতিপয় ইউপি জনপ্রতিনিধি-সদস্য সহ প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে।ফলে সরকারের বৃহৎ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির আওতাভুক্ত কর্মক্ষম দুস্থ পরিবার সমূহের স্বল্পমেয়াদী কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দারিদ্র নিরসন ও দুর্যোগ ঝুঁকিহ্রাসের সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের সফল বাস্তবায়ন ভেস্তে যেতে বসেছে।এতে জেলার দরিদ্র‍্য জনগোষ্ঠীর ভাগ্য উন্নয়ন কাগজে কলমে শতভাগ দেখা গেলেও বাস্তবতার ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে শেয়ার বিজের অনুসন্ধানে।
সূত্রমতে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রলালয়ের মঞ্জুরী আদেশের প্রেক্ষিতে ‘অতিদরিদ্রদের জন্য আত্মকর্মসংস্থান’ কর্মসূচির ২০২১-২০২২ অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দকৃত ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা হতে দ্বিতীয় পর্যায়ের কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য নন-ওয়েজ কস্ট ব্যবদ ৩৫ কোটি ১১লাখ ১৪ হাজার ৯৭২ টাকা মঞ্জরী প্রদান করা হয়।মঞ্জুরীকৃত অর্থ হতে দ্বিতীয় পর্যায়ে চট্টগ্রাম বিভাগের ৮টি জেলার ৬৫ টি উপজেলার অতিদরিদ্রদের জন্য আত্মকর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি) প্রকল্প বাস্তবায়নের নিমিত্তে নন-ওয়েজ কস্ট ব্যয় নির্বাহের জন্য সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের অনূকুলে ৫ কোটি ১৩ লাখ ৯৬ হাজার ৫০০ টাকা শর্ত সাপেক্ষে খাতওয়ারী বরাদ্দ দেয়া হয়।দ্বিতীয় পর্যায়ের কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য চাঁদপুর জেলার ৮৯ টি ইউনিয়নে ১০ হাজার ৬০৫ জন উপকারভোগীর জন্য নন ওয়েজ কস্ট খাতে সর্বমোট ৭৭ লাখ ৯০ হাজার ৬৭ টাকা   ব্যয় নির্বাহের জন্য বরাদ্দ প্রদান করা হয়।প্রকল্পের প্রথম পর্যায়েও অনূরুপ বরাদ্দ প্রদান করা হয় জেলার ৮৯ টি উপজেলায়।
সরেজমিনে অনুসন্ধানকালে জানা গেছে, ফরিদগঞ্জ উপজেলার ৭নং পাইকপাড়া উত্তর ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের ‘কামালপুর পাকা রাস্তা থেকে পশ্চিমমুখী সাহাবাড়ী পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার’ কাজ দ্বিতীয় পর্যায়ে শুরু হয়। প্রকল্পে রাস্তার কাজ শেষ করে উপকারভোগীর টাকা উত্তোলনের নিয়ম থাকলেও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে কাজ শেষ হওয়ার পূর্বেই ২৭ জন শ্রমিকের ৪০ দিনের কাজের মজুরীর ৪ লাখ ৩২ হাজার টাকা উত্তোলন করার অভিযোগ পাওয়া যায় প্রকল্পের সভাপতি ইউপি সদস্য শাহ আলম সহ ৫ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শামীম ও ৪ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আকরাম মেম্বার এর বিরুদ্ধে।
সূত্রমতে,২০২১-২০২২ অর্থবছরের ইজিপিপি প্রকল্পের  প্রবার্টি ইনডেক্স অনুযায়ী সি ক্যাটাগরিতে থাকা পাইকপাড়া ইউনিয়নে দারিদ্র্যতার হার ২৭ দশমিক ২০ভাগ  উল্লেখ থাকলেও রহস্যজনক কারণে তালিকা থেকে বাদ পড়েছে ৬নং ওয়ার্ডের অধিকাংশ দরিদ্র মানুষ। এই ওয়ার্ডেই ৪লাখ ৩২ হাজার টাকার প্রকল্প থেকে কোনো সুবিধা পাননি নিন্ম আয়ের দরিদ্র মানুষ।
 এদিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের আওতাভুক্ত এলাকা কামালপুরের পাকা রাস্তা থেকে প্রায় দুইশো মিটার রাস্তার সংস্কার কাজ না হওয়ার কারণে দুর্ভোগ বেড়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পের সভাপতি ৬নং ওয়ার্ড থেকে ২৭ জন উপকারভোগীর তালিকা দেয়ার কথা থাকলেও অতিদরিদ্রদের ওয়ার্ডভিত্তিক চূড়ান্ত তালিকা পর্যালোচনায় দেখা যায়, ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডে ৫০ জন,২নং ওয়ার্ডে ২৩ জন,৩নং ওয়ার্ডে ২৬ জন, ৪নং ওয়ার্ডে ১২ জন ৭নং ওয়ার্ডে ৪৫ জন, ৮ নং ওয়ার্ডে ৫০ জন সহ মোট ইউনিয়নে মোট ২৯৫ জন উপকারভোগীর চূড়ান্ত তালিকা থাকলেও ৬ নং ওয়ার্ডের উপকারভোগীদের কোনো তালিকা নেই।কামালপুর রাস্তা সংস্কার প্রকল্পে ৫নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য উপকারভোগীর তালিকা দিয়েছেন ১৪ জনের, ৪নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আকরাম উপকারভোগীর তালিকা দিয়েছেন ৪জনের, ৬নং ওয়ার্ডের মেম্বারের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী তিনি উপকারভোগীর তালিকা দিয়েছেন ৩ জনের।২৭ জনের মধ্যে বাকি ৬ জন উপকারভোগীর তালিকার কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।প্রকল্পে বরাদ্দকৃত  টাকা G2P পদ্ধতিতে পরিশোধ করতে সংশ্লিষ্ট  উপজেলা  ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিকে  দাখিলকৃত উপকারভোগীদের মোবাইল নম্বর সম্বলিত তালিকা যাচাই বাচাই করে বাস্তবায়ন, চূড়ান্তকরণ ও অনুমোদন দেয়ার নিয়ম থাকলেও স্বজনপ্রীতি করে তালিকা তৈরি করায় তালিকাভুক্ত উপকারভোগীদের  মোবাইলে টাকা আসার পর প্রকল্পের কাজ শেষ না করেই টালবাহানা শুরু করে।ফলে প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। প্রকল্পে কাজ করেও টাকা পাননি এমন অভিযোগও তুলেছেন ভুক্তভোগী অনেকেই।
ফরিদগঞ্জের পিআইও মিল্টন দস্তিদারের সাথে এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি একবার কথা বলে আর কখনও ফোন রিসিভ করেননি। কয়েকবার অফিসে গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
অপরদিকে,হাজীগঞ্জ উপজেলার ৮নং হাটিলা পূর্ব ইউনিয়নে আঞ্জুম আরা  নামে এক উপকারভোগীর আইডি(১১২৯২) মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠে ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য খোরশেদ আলমের বিরুদ্ধে।ইউপি সদস্য খোরশেদ আলম জানান,মোবাইল নম্বর ভুল হওয়ায় উপকারভোগীর মোবাইলটি আমার কাছে রেখেছি।
 মতলব উত্তর উপজেলার এখলাসপুর ইউনিয়নের রাবিয়া খাতুন নামে আরেক উপকারভোগী (আইডি-১০০৮০)বলেন ,রাস্তায় কাজ করেও আমি টাকা পাইনি।আমার মোবাইল নম্বর ভুল হয়েছে বলে আমার কাছ থেকে মোবাইল নিয়ে পরে ফেরত দেন স্থানীয় ইউপি সদস্য।চাঁদপুর সদর উপজেলার ৪নং শাহ মাহমুদপুর ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশের মহল্লাদার লাকি আক্তারের মোবাইল নম্বরে ইজিপিপি প্রকল্পের টাকা রিচার্জ হয়েছে।লাকি আক্তার ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন।ইজিপিপি প্রকল্পের তথ্য ইউনিয়ন পরিষদের নোটিশ বোর্ডে জনস্বার্থে সাঁটানো ও প্রচারের নির্দেশনা থাকলেও ৪নং শাহমাহমুদপুর ইউনিয়নের ইউপি সচিব প্রকল্পের কোনো  তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
শাহরাস্তি উপজেলায় প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সবুজ মিয়ার বিরুদ্ধেও প্রকল্পের নিয়মনীতি না মেনে সাইনবোর্ড তৈরি করে অর্থ আত্মসাত করার  অভিযোগ উঠে।প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী শক্ত কাঠ ও স্টীলের ফ্রেমযুক্ত সিআইজি সিট দিয়ে সাইনবোর্ড তৈরির কথা থাকলেও পিআইও’র যোগসাজশে স্থানীয় এক ডিজিটাল প্রিন্ট ব্যবসায়ীর মাধ্যমে ২৪০ জিএসএম  পিভিসি মিডিয়ায়  কাঠের ফ্রেমযুক্ত  সাইনবোর্ড তৈরির সত্যতা পাওয়া যায়। প্রতিটি সাইনবোর্ড এর নির্মাণ ব্যয় ব্যবদ ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা খরচ হলেও ৩০ টি সাইনবোর্ড তৈরিতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় দেখিয়ে বিল ভাউচার তৈরি করা হয়।২০২০-২০২১ অর্থবছরে প্রকল্পের সভাপতির যোগসাজশে প্রকল্পে নামমাত্র কাজ করে অর্থ আত্মসাতের অসংখ্য অভিযোগ উঠে পিআইও সবুজ মিয়ার বিরুদ্ধে। এতো অভিযোগের পরও তিনি আছেন বহাল তবিয়তে!
পিআইও সবুজ মিয়া এসব অনিয়মের সত্যতা অস্বীকার করে বলেন,”সব ইউএওনও  জানেন,ওনার সাথে কথা বলেন।”বর্তমানে সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এই কর্মস্থল থেকে বদলি হয়েছেন।
চাঁদপুর জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে উপজেলা, ইউনিয়ন,  ওয়ার্ড প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির দাখিলকৃত উপকারভোগীদের তালিকা তৈরি বাস্তবায়ন ও পরিকল্পনা চূড়ান্তকরণে নিয়ম মানা হয়নি বলে অভিযোগ উঠে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। ওয়ার্ড ইউপি সদস্য,প্রকল্পের উপসহকারী প্রকৌশলী, ট্যাগ অফিসার এবং কমিউনিটি সদস্যদের তদারকিতে উপকারভোগীদের কাজের তদারকি, তালিকা জনসম্মুখে প্রকাশ ও প্রচার নিশ্চিত না করে  রাজনৈতিক বলয়ের  উপজেলা ইউনিয়ন ওয়ার্ডের কতিপয় সুবিধাভোগী নেতারা তাদের মর্জিমাফিক নিজেদের পছন্দের উপকারভোগী নির্বাচন করে মোবাইলের মাধ্যমে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাত করার পায়তারা করায় সরকারের জনকল্যাণমূখী নিরাপত্তা বেষ্টনীর উদ্যোগের প্রকৃত সুফল পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে জেলার অধিকাংশ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মানুষ।


এই বিভাগের আরও খবর