প্রিয় চাঁদপুর রিপোর্টঃ চাঁদপুর সদর লক্ষীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সেলিম খান। যিনি ইতিমধ্যে গণমাধ্যমে ‘বালুখেকো’ নামে পরিচিতি পেয়েছেন। তার পুত্র শান্ত খান শান্ত এন্টারপ্রাইজের মালিক। তিন বছর আগে সেই শান্ত খানের প্রতিষ্ঠানকেই চাঁদপুর সদরের পদ্মা ও মেঘনা নদীর মোহনায় বাঁশগাড়ী মৌজায় হাইড্রোগ্রাফিক জরিপের অনুমতি দেন জেলার তৎকালীন জেলা প্রশাসক। এক মন্ত্রীর ডি.ও পত্র এবং শান্ত খানের আবেদনের প্রেক্ষিতেই ওই অনুমতি দেয়া হয়। সেই অনুমতির ভিত্তিতেই হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ চালিয়ে সংশ্লিষ্ট ডুবোচরে ৮ কোটি ৬০ লাখ ৪৪ হাজার ঘনফুট মাটি/বালি থাকার অস্তিত্ব পায় প্রতিষ্ঠানটি।
সেই হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে শান্ত খানের প্রতিষ্ঠানকে বালু উত্তোলনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছিলো হাইকোর্ট। কিন্তু হাইকোর্টে ওই রিট মামলায় জারিকৃত রুলের বিরুদ্ধে ভূমি সচিব, নৌপরিবহন সচিব, বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান, চাঁদপুর জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ নয় বিবাদী কোন জবাব দাখিল করেনি। ফলে নির্বিঘ্নে রায় পান শান্ত খান। ২০২০ সালে এই রায় দেওয়ার আড়াই বছর পর গত জুলাই মাসে তা স্থগিতে আপিল বিভাগে আবেদন করে সরকার। দীর্ঘদিন পর রায় স্থগিতের আবেদন এবং রিট মামলায় রুলের জবাব না দেয়ায় সরকারি কর্মকর্তাদের ভূমিকায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতের বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম।
খোদ রাষ্ট্রের শীর্ষ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এএম আমিন উদ্দিনের উদ্দেশ্যে ওই বিচারপতি বলেছেন, সরকারি কর্মকর্তারা তো জায়গামতো ম্যানেজ হয়ে যান। উনারা অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে কি পদক্ষেপ নিয়েছে, বলুন। আড়াই বছর পর এসে রায় স্থগিতের আবেদন জানাচ্ছেন কেন? বিচারপতি ইনায়েতুর রহিম বলেন, যেখানে চোর (সেলিম খান/শান্ত খান) চিহ্নিত হয়েছে, সেই চোর না ধরে আদালতের কাছে নির্দেশনা চাচ্ছেন। আর সরকারি আইন কর্মকর্তারাই (হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের দায়িত্বপ্রাপ্ত) কি ভূমিকা রেখেছেন? এত বড় একটি মামলায় সরকার পক্ষে হাইকোর্টে কোন জবাব দাখিল কেন হয়নি। কারা এসব ঘটনায় জড়িত তাদের বিষয়ে আন্ডার টেকিং (অঙ্গীকারনামা) দিন। আমরা দেখতে চাই এরা কারা। তখন অ্যাটর্নি জেনারেল এ বিষয়ে তালিকা দিতে চাইলে হাইকোর্টের রায় ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত স্থগিতের আদেশ দেন চেম্বার জজ আদালত।
এর আগেও হাইকোর্টে সেলিম খানের রিট মামলায় সরকার পক্ষ থেকে কোন জবাব দাখিল করা হয়নি। এ নিয়েও তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলো দেশের সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগ। গত ২৯ মে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়, সেলিম খানের করা রিট মামলার রুল শুনানিতে সরকারের পক্ষ থেকেও কোন এভিডেভিট দাখিল করা হয়নি। হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে ওই সময়ে যিনি সরকারি আইন কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেছেন তার আচরণ সন্দেহজনক। এমনকি দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলন করলেও তার বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ না নিয়ে চাঁদপুর জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যেন ঘুমিয়ে ছিলেন। যার কারণে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব বঞ্চিত হয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সরকার।
শান্ত খানের বয়স ২০ বছর। তার মালিকানাধীন শান্ত এন্টারপ্রাইজ ২০১৯ সালের ২৬ মে চাঁদপুরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক (ডিসি) বরাবর চিঠি দেন। ওই চিঠিতে পদ্মা/মেঘনা নদীর মোহনায় নাব্যতা রক্ষায় নৌ-ফেরি চলাচলের সুবিধার্থে হাইড্রোগ্রাফিক জরিপের ব্যয়বাবদ টাকা গ্রহণ এবং দেশীয় প্রযুক্তির ড্রেজার দ্বারা নিজ খরচে ডুবোচর থেকে নদী খনন করে বালু উত্তোলনের অনুমতি চান। এই চিঠির প্রেক্ষিতে ওই বছরের ৩০ মে শান্ত এন্টারপ্রাইজকে জরিপের অনুমতি দেয় ডিসি মো. মাজেদুর রহমান খান। অনুমতি পেয়ে সংশ্লিষ্ট বাঁশগাড়ী মৌজায় জরিপ করে ৮ কোটি ৬০ লাখ ৪৪ হাজার ঘনফুট বালু/মাটি উত্তোলনের জন্য প্রতিবেদন দেওয়া হয়। পরে এ সংক্রান্ত চিঠি জেলা প্রশাসকের দপ্তর থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিআইডব্লিউটিএতে পাঠানো হয়।
এরপর জরিপ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বালু উত্তোলনের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা। ওই রিটের প্রেক্ষিতে জারিকৃত রুলের উপর ভূমি সচিবসহ কোন বিবাদী জবাব দাখিল করেননি। এমনকি ওই সময়ে সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে দায়িত্বরত সরকারি আইন কর্মকর্তাও শুনানিতে অংশ নেননি। ফলে রিটকারী পক্ষের শুনানির প্রেক্ষিতে রুল গ্রহণ করে শান্ত এন্টারপ্রাইজের পক্ষে ২০২০ সালের ৫ মার্চ রায় দেয় হাইকোর্ট। এই রায় স্থগিত চেয়ে গত ২৮ জুলাই লিভ টু আপিল করে সরকার।
এই আপিলের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে ডিএজি কাজী মাইনুল হাসান বলেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে পরিবেশের বিপর্যয় হচ্ছে। এমনকি ইলিশ প্রজনন হুমকির মুখে। তিনি বলেন, আইনানুযায়ী কোন এলাকা থেকে বালু উত্তোলন করতে হলে সংশ্লিষ্ট স্থানকে বালুমহাল ঘোষণার পাশাপাশি উন্মুক্ত টেন্ডার করতে হবে। এ ধরনের কোন আইন না মেনেই অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অনুমতি পেয়েছেন শান্ত খান। রিটকারীর আইনজীবী মুন্সী মুনীরুজ্জামান বলেন, আমরা কোন বালু উত্তোলন করছি না।
এ পর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর উদ্দেশ্যে আদালত বলেন, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে এত বছর কেন আবেদন করেছেন? অ্যাটর্নি জেনারেল এ.এম আমিন উদ্দিন বলেন, যখনই আমাদের অবহিত করা হয়েছে তখনই আপিল করা হয়েছে। রায় স্থগিতের আবেদন করছি।
আদালত বলেন, আপনাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারা কি করেছেন? কেন রুলের জবাব তারা দেয়নি। আর সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের তৎকালীন দায়িত্বরত আইন কর্মকর্তাই কি করেছেন। কেন হাইকোর্টে রুল শুনানিতে অংশ নেয়নি। এই বালু উত্তোলনের বিষয়ে সরকারি কর্মকর্তা ও আইন কর্মকর্তাদের কার কি দায়িত্ব ছিলো তাদের নাম দেবেন। তারা আদৌও সোই দায়িত্ব পালন করেছেন কিনা সেটাও স্পষ্টভাবে জানতে চাই। শুনানি শেষে হাইকোর্টের রায় স্থগিত করে দেওয়া হয়।
সুত্রঃ ইত্তেফাক