রাফিউ হাসান হামজাঃ
শাহরাস্তিতে সরকারী প্রাক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২০২১-২২ অর্থ বছরের ১০১টি বিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত ১০ হাজার টাকার প্রকল্পে সুষ্টভাবে বিদ্যালয়ের প্রাক প্রাথমিক কমিটি প্রয়োজনীয় কাজে খরচ করার কথা থাকলেও অনৈতিকভাবে প্রতারক চক্র কর্তৃক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে চাপিয়ে দেওয়া ৫ হাজার টাকার মালামাল বন্টনের অভিযোগ পাওয়া গেয়েছে।
শাহরাস্তিতে অপ্রয়োজনীয় মালামাল বন্টনে নিজমেহার মডেল পাইলট সপ্রাবি’র প্রধান শিক্ষক ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ!
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শাহাবউদ্দিন (সদ্য বিদায়ী) সাথে সখ্যতার মাধ্যমে পুরো শাহরাস্তিতে নিয়ন্ত্রণে রাখছেন তিনি, এই অভিযোগও পাওয়া গেছে।
গত জুন মাসে প্রত্যেক প্রাক প্রাথমিক শাখার জন্য ১০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার। শাহরাস্তিতে ১০১ টি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের একাউন্টে সরকারী কর্তন বাবদ সর্বমোট জমা হয় ৯ লক্ষ ৩৬ হাজার ৭শত ৭৫ টাকা। ওই টাকা দিয়ে প্রত্যেক বিদ্যালয়ে শিশুদের কক্ষে খেলনা ক্রয় ও সৌন্দর্য বর্ধনের নির্দেশনা দেয়া হয়। অথচ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের বরাত দিয়ে মালামাল ক্রয় করতে শাহরাস্তির সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের তাগিদ দেন।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, শাহরাস্তিতে মোট ১০১ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ৯০ টি বিদ্যালয় এই প্যাকেজ ক্রয় করে। সর্বসাকুল্যে ২ হাজার টাকার মালামাল ৫ হাজার টাকায় ক্রয় করেন।
সরেজমিনে গিয়ে জান যায়, মাত্র ২ হাজার টাকার খেলনা ও শিক্ষা সরঞ্জামের নাম করে প্রতিটি বক্স বাবদ ৫ হাজার টাকা নিয়েছেন শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম ও তার সাথে থাকা একটি চক্র।
শাহরাস্তিতে অধিকাংশ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে খেলনা পন্যের বক্সটি পাওয়া যায়। তা খুলে ভিতরে মালামালগুলোর পরিমাণও কম দেখা যায় অনেক প্রতিষ্ঠানে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রধান শিক্ষক জানান, প্রাক প্রাথমিকে আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে নিজেদের ইচ্ছেমতো কাজ আমরা চাইলেও করতে পারি না। বক্সে থাকা অধিকাংশ মালামাল আমাদের আগে থেকেই ছিলো। তবুও উপর মহলের নির্দেশে আমরা বক্সগুলো নিতে বাধ্য হয়েছি। কে বাধ্য করেছেন, এমন প্রশ্নে তারা বিষয়টি এড়িয়ে যায়।
জানা যায়, উপজেলায় সকল বিদ্যালয়ে বক্সগুলো পাঠান নিজমেহার মডেল পাইলট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম। যিনি আবার জেলা ও উপজেলা প্রাইমারী শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সাথে সখ্যতার সুযোগে পুরো উপজেলায় টাকার বিনিময়ে অবৈধ সুযোগ সুবিধা প্রদান করা, শিক্ষকদের সাথে বাজে আচরণ সহ আরও নানা অভিযোগ রয়েছে জাহাঙ্গীর আলম এর বিরুদ্ধে।
খেলনা ক্রয়-বিক্রয়ের সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, শাহরাস্তিতে অল্প কিছু বিদ্যালয়ে এসব খেলনা বিক্রি হয়েছে। যারা এই প্যাকেজ নিয়েছে তারা সকলেই সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েই একই স্থান থেকে এগুলো ক্রয় করেছে। এসোসিয়েশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে আমি বিতরণ করেছি। তবে খেলনা ক্রয়ে কোনো দূর্ণীতি হয় নি। চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে সকল বিদ্যালয়ে খেলনা ক্রয়ে উদ্ভুদ্ধ করা প্রসঙ্গে তিনি কোনো কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
খেলনা বিক্রয় করা প্রতিষ্ঠান শবনম ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারীর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তার ব্যবহারিত মোবাইল নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া যায়।
অভিযোগের ব্যাপারে শাহরাস্তি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লুৎফর রহমান বলেন, প্রাক প্রাথমিকে বরাদ্দকৃত অর্থ সকল প্রধান শিক্ষকদের নিজস্ব একাউন্টে পাঠানো হয়েছে। তারা তাদের বিদ্যালয়ের নিজস্ব প্রয়োজনে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় করবেন। বক্সের ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, এই ব্যাপারে আমাদের কোন নির্দেশনা ছিলো না। এ ব্যাপারে কেউ অভিযোগ করলে অবশ্যই তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান।
তিনি আরও বলেন, প্রাক প্রাথমিক শ্রেণীর শিখন-শেখানো সামগ্রী ক্রয় বা তৈরী বা শ্রেণী কক্ষ সাজানোর ক্ষেত্রে প্রতিটি বিদ্যালয়ে ৩ সদস্য বিশিষ্ট গঠিত কমিটির মাধ্যমে ক্রয় করতে হবে। যদি কেউ অপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলো প্রয়োজন ছাড়া ক্রয় করে থাকেন বা একই জিনিস বিদ্যালয়ে একাধিক থাকে তা ক্ষতিয়ে দেখা হবে।
মুঠোফোনে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো.শাহাব উদ্দিন (সদ্য বিদায়ী) কে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানান। তাহার সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি তাও অস্বীকার করেন।
যারা সমাজের পথ প্রদর্শক হয়ে সমাজকে আলোকিত করবে, তারাই যখন অন্যায়ের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যাচ্ছে তখন সমাজের বাস্তবিক অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
এটাই মনে করছেন সুশীল সমাজের সুনাগরিকরা।