শিরোনাম:
১৭ জন শিক্ষার্থীর স্বপ্নের সারথি হলে স্বপ্নের ফরিদগঞ্জ সংগঠন ফরিদগঞ্জ মানবসেবা ফাউন্ডেশন পথচারী ও এতিম শিশুদের মাঝে ইফতার বিতরণ সম্পন্ন ফরিদগঞ্জে পৌর এলাকায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এক্স  স্টুডেন্ট ক্লাব চাঁদপুরের  ইফতার ও দোয়া মাহফিল ফরিদগঞ্জের ক্রীড়াঙ্গনকে এগিয়ে নিতে নিজেই চালকের ভূমিকায় আহসান হাবীব মতলব দক্ষিণে জাতীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবস পালিত  ফরিদগঞ্জে জামায়াতে ইসলামীর ন্যায্য মূল্যে পণ্য বিক্রির আনুষ্ঠানিক শুভ উদ্বোধন চাঁদপুর জেলা পুলিশের মাস্টার প্যারেড অনুষ্ঠিত চাঁদপুর -ফরিদগঞ্জ সড়কে বালুবাহী মিনি ট্রাকের ধাক্কায় নিহত ১ বর্ণিল আয়োজনে চাঁ.স.ক শিবিরের প্রকাশনা উৎসব

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণা পাঠ

reporter / ৩৩১ ভিউ
আপডেট : রবিবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২২

মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান

১৬ই এপ্রিল। ঊনিশশো একাত্তর সাল। রাতদশটা। মুজিবনগরে একটি বাড়িতে বসে আছেন অধ্যাপক ইউছুফ আলী। সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেব হঠাৎ এসে উপস্থিত হলেন। এসেই বললেন- কালকে অধ্যাপক ইউছুফ আলীকেই স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করতে হবে।

এটা সকলের সিদ্ধান্ত। তৈরি থাকার অনুরোধ করে বেরিয়ে গেলেন, অপেক্ষা করলেননা। অধ্যাপক ইউছুফ আলী চমকে উঠলেন। তাঁরমনের পর্দায়ভেসে উঠলো- সাড়ে সাত কোটি মুক্তি পাগল বাঙালির স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র তিনি পাঠ করছেন যা আগামীকাল বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে দখলদার পাকবাহিনী ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবে। প্রতিশোধ নিতে চাইবে। তখনো তাঁর মা, স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, ভাই-বোন দিনাজপুরে আছে বলেই শুনেছেন। তবে কেমন ও কি অবস্থায় আছে জানেন না। তাইতাঁরভয়- দস্যুবর্বরবাহিনীক্ষেপেগিয়েপরিবারেরসদস্যদেরউপরইপ্রতিশোধনিতেপারে। সাথে সাথে মনে এক অনাস্বাদিত অনুভুতিও জাগে তাঁর মনে- বিশ্বেক’জনার ভাগ্যে এ সুযোগ আসে। একটি নতুন জাতির স্বাধীনতার ঘোষণা  পাঠের গৌরব- এতো তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। ১৭ ই এপ্রিলবৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে তাঁরই কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণা।
সে রাতে তাঁর ভালো ঘুম হয়নি। একটা অস্থিরতা তাঁকে পেয়ে বসে। মনে আসেনা না কথা, নানা স্মৃতি। বাংলাদেশ স্বাধীন হতে যাচ্ছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু আজ কোথায়?  কেমন আছেন? আদৌ বেঁচে আছেন কিনা? তিনি এখন তাঁদের মাঝে নেই- একথা বিশ্বাস হতে চায়না। তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত প্রতিটি নির্দেশ কানে বাজছে। মনে হলো, এইতো বঙ্গবন্ধু, কাছেই আছেন। পাশের ঘরেই হয়ত, ডাক পড়বে। নির্জন কক্ষে শুয়ে এ সব ভাবছেন তিনি। চোখে ঘুমনেই, প্রতিটি মুহূর্তেই একটি নতুন অনুভূতি। কতক গুলো মুখ তাঁর চোখের সামনে ভাসছে। তাঁরমা, স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে ভাই-বোন। ভাসছে গ্রামের মানুষের মুখ। বাংলাদেশের মানুষের মুখ তিনি দেখতে পাচ্ছেন। স্মৃতির উত্তাপ বাড়ছে, বাড়ছে অস্থিরতা। সত্যি কথা হলো সেদিনের কথা ভাবতে গেলেই তিনি আবেগ প্রবণ হয়ে পড়তেন হয়ত এ তাঁর দুর্বলতা, হয় ত নয়। কিন্তু এটি ছিল তাঁর জীবনের মধুরতম স্মৃতি।
পরদিন সকালেই উঠে পড়লেন। তবে বিপদ একটা ঘটলো। তাঁর পরনে তো লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি। তাও ধোয়া নয়। সাথে দ্বিতীয় কোনো কাপড় নেই। এখন উপায়! ছুটে গেলেন কামারুজ্জামান সাহেবের আস্তানায়। তাঁর অবস্থা শুনে কামারুজ্জামান সাহেবের মুখে ওম্লান হাসি। তিনি বললেন একসেট পাঞ্জাবি আছে বটে তবে মাপে বড়ো হবে। তবুও রাজি হয়ে গেলেন ইউসুফ সাহেব। পাঞ্জাবির দুটো পকেট ইছিল ছেঁড়া। সাত-আট দিন সেভ করেননি। খোচা খোচা দাড়ি। পরে দেখলেন অন্যদের অবস্থাও প্রায় এক।
১৭ই এপ্রিল বেলা দশটার দিকে তারা গাড়িতে মেহেরপুরের বৈদনাথতলায় পৌঁছান। সুদৃশ্য আম্রকাননে বিরাট মঞ্চ। মঞ্চের উপর দুটো টেবিল। সাত খানা চেয়ার পাতা রয়েছে। মঞ্চের তিন পাশে কয়েকশো চেয়ার ও বেঞ্চ। মঞ্চের ঠিক সামনে কিছুটা জায়গা চাদর বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এক পাশে এম এন এ ও এ মপি এগণ, এক পাশেদেশি-বিদেশি সাংবাদিক ও প্রেসফটোগ্রাফার আর সামনে কয়েক হাজার মানুষ।
বৈদনাথ তলা বর্ডার আউট পোস্টে তারা চা বিস্কুট খেয়ে নিলেন। স্থানীয় সশস্ত্র জোয়ান বাহিনী ও আওয়ামীলীগ কর্মীরাই এর ব্যবস্থা করেছেন। কয়েকজন বাঙালি তরুণ সিভিল অফিসারকে ও দেখতে পেলেন। তাদের মাঝে দু’জন হলেন- তৌফিক-ই-এলাহী ও ক্যাপ্টেন মাহবুব উদ্দীন।
চাপানের মধ্যেই অস্থায়ী রাষ্ট্র প্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণার পাতাটি তাঁর হাতে দিলেন। আর বললেন, এটি এক্ষুণি বাংলায় অনুবাদ করে নিতে। তিনি দেখলেন ঘোষণাটি ইংরেজিতে টাইপ করা। তখন হাতে একদম সময় নেই। সবাই একে একে আম্রকাননের মঞ্চের দিকে চলে গেলেন। অধ্যাপক ইউছুফ আলী ও বরিশালের এম পি এ জনাব নুরুল ইসলাম ঘোষণাটি বাংলায় অনুবাদ করছিলেন। অনুবাদ কেমন হয়েছে সেদিকে খেয়াল নেই। সময় যে দ্রুত পার হয়ে যাচ্ছে। বেশি দেরিকরা চলবেনা। একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করতেই হবে।
এমন সময় ছাত্রনেতা আ স ম আব্দুর রব দৌড়ে এসে অধ্যাপক ইউছুফ আলী কে বললেন, “স্যার, জাতীয়সংগীততোকেউগাইতে জানেনা।  আপনাকেই গাইতে হবে।”
অধ্যাপক ইউছুফ আলী কয়েকটি ছেলেকে নিয়ে আসতে বললেন। আব্দুর রব আবার দৌড়ে গিয়ে চার পাঁচ জন ছেলেকে এনে তাঁর সামনে উপস্থিত করলেন। বিনা হারমো নিয়ামেই ওদের নিয়ে তৎক্ষনাৎ বসেগেলেন। একটি কাগজে আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি- গানের প্রথম আট লাইন লিখে ওদের হাতে দিলেন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সুরটা তুলে ওদেরকে প্রস্তুত করে নিলেন এবং বললেন, “জাতীয় সংগীতের পরই আমার ঘোষণা পাঠ থাকবে। তাই তোমাদেরই গাইতে হবে।”
-২-
অতিথিবৃন্দ ও সাংবাদিকদের সামনে আনুষ্ঠানিক ভাবে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হলো। বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল কমান্ডের পক্ষ থেকে ক্যাপ্টেন মাহবুব এবং ক্যাপ্টেন এলাহী আনুষ্ঠানিক ভাবে জাতীয় পতাকাকে অভিবাদন জানান। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অভ অনার প্রদান করা হয়।
মঞ্ চথেকে পবিত্র কোরআন পাঠেরসুর এল। তারাদ্রুত পায়ে সেখানে উপস্থিত হলেন। অনুবাদক পিতে যথেষ্ঠ কাটা ছেড়া রয়েছে। কিন্তু ভালো করে লেখার তখন আর সময় নেই।
মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন অস্থায়ী রাষ্ট্র প্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম,  প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদ, মন্ত্রি পরিষদের সদস্য মোহাম্মদ মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান। সবার ডানে রয়েছেন প্রধান সেনাপতি কর্নেল আতাউল গণি ওসমানী।
কোরআন তেলাওয়াত এরপর জাতীয় সংগীত। সমবেত কণ্ঠে যখন ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’ গানের সুর তখন অলক্ষ্যে অধ্যাপক ইউছুফ আলীর চোখে অশ্রু। তিনি লক্ষ্য করে দেখলেন- সবার চোখই অশ্রুসিক্ত। সে এক অনন্য মুহূর্ত। অনাস্বাদিত উষ্ণ অনুভূতি।
এর পরই টাঙ্গাইলের এম এন এ আবদুল মান্নান স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণা পাঠ করতে অধ্যাপক ইউছুফ আলীকে আমন্ত্রণ জানালেন।
হঠাৎ একটি আশ্চর্য পরিবর্তন অনুভব করলেন অধ্যাপক ইউসুফ আলী। এতক্ষণের ভয়-ভীতি, শঙ্কা, আনন্দ, অস্থিরতা থেকে যেন তিনি নিমিষেই মুক্তবোধ করলেন। ধীরপদক্ষেপে মঞ্চে উঠলেন। অসংখ্য ক্যামেরা তাঁকে ঘিরে রেখেছিল। তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করলেন। পাঠ শেষে ঘোষণাটি তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্র প্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেবের হাতে অর্পণ করেন। তখনবেলা আনুমানিক এগারোটা। মন্ত্রি পরিষদের সকলে পরস্পর হাতে হাত মিলালেন। তখন তুমুল কর তালি।
এর পরই অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম তেজোদ্দীপ্ত ভাষণদেন। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের নবগঠিত বাংলাদেশ সরকারের বৈদেশিক নীতির ব্যাখ্যা দেন। ওই দিন বিদেশি সাংবাদিকরা একটা চাতুর্য পূর্ণ প্রশ্ন করেন, ‘‘বাংলাদেশের রাজধানী কোথায়’’? তাজউদ্দীন উত্তর দিয়েছিলেন যে, ‘‘মুজিবনগর’’। ২২শে ডিসেম্বর বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরনা হওয়া পর্যন্ত ঘোষিত রাজধানী ছিল ‘‘মুজিবনগর’’।
এরপর চারদিক থেকে হাজারো কণ্ঠে উচ্চারিত হলো- ‘জয়বাংলা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব জিন্দাবাদ’। স্লোগানের ধ্বনি আছড়ে পড়ছে আম্র কাননে, পড়ছেসমবেতসবারহৃদয়ে। সাগরেরকল্লোলজাগেসবারপ্রাণে। হৃদয়েরউষ্ণআবেগেএকেঅন্যকেবুকেটেনেনেয়। মাথারউপরমধ্যাহ্নেরসূর্যযেন আলোর স্পর্শে আশীর্বাদ করলো সবাইকে।
#
লেখক-প্রকল্পপরিচালক,  গণযোগাযোগ অধিদপ্তর
১৩.০৪.২০২২ পিআইডিফিচার


এই বিভাগের আরও খবর