মাহবুব আলম প্রিয়ঃ
শোক প্রকাশ করতে দলবেঁধে কালো রংয়ের পোষাক গায়ে দিতে হবে। দিয়ে শোক প্রকাশ করতে হবে। বা এমন করতে দেখা যায় সবখানে। তাহলে কী গানে কবিতায় থাকা, কষ্টের গায়ে লাল জামা, বেদনার গায়ে নীল’ পোষাক হতে পারতো? বোধহয় তা নয়। হলে তো রক্তের দাগের সঙ্গে লাল বেদনা মিলে যেত। আর শোকাহতরা নীল জামা গায়ে জড়াতেন। কিন্তু বাস্তবে তো সাদা কালো পোষাকেই শোক প্রকাশ করতে দেখি।
প্রশ্ন হলো, এমন নিয়ম কোন ধর্মের? কোন দেশের? কার তৈরী রীতি? এর হেতু কি? এটা যদি কোন ধর্মের রীতি হয় তা সবার মানা কতটুকু যৌক্তিক? আর যদি কোন পন্ডিতের উপন্যাসিক গল্পের চরিত্র হয় তাহলে এমন মানা না মানার মাঝে কি থাকবে?
শোকের পোষাক কালো কেন জানতে চেয়ে গুগল সার্চ ইঞ্জিন থেকে নেয়া তথ্যে জানতে পারি, বিশ্বখ্যাত উইলিয়াম শেক্সপিয়র একবার শোকের রঙকে কালো বলেছিলেন। পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে, একজন মৃত ব্যক্তির জন্য শোকের চিহ্ন হিসাবে শেষকৃত্যে কালো রঙের পোশাক পরার রীতি রয়েছে। অবশ্য কেউ কেউ মনে করেন কালো পোশাক পরার রীতিটা রোমান সাম্রাজ্যের দিনগুলোতে, যখন নাগরিকেরা তাদের শোকের দিনগুলোতে অন্ধকারকে বেছে নিতেন এবং পশমের টোগা পরতেন।
আমাদের দেশে এর কারনে কালো পোষাকের প্রচলন তার কোন ব্যাখ্যা নেই।
এদিকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বলছেন, মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে কালো রঙের পোশাক পরা পুরোটাই মনের ওপর। কালো পোশাক পরার অর্থ জীবনের প্রতি নিরাশ হওয়া নয় বরং কারো প্রিয় ও নিকট কাউকে হারানোর শোক প্রকাশ।
তাদের আরও দাবী, কাছের আত্মীয় বা প্রিয় মানুষের মৃত্যু হলে কালো পোশাক তার মনে দুঃখের অনুভূতি সৃষ্টি করে ও তাকে এ শোকের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় ও নীরবতা পালনে উদ্বুদ্ধ করে। কালো পোশাক তার মনের সাথে তা বাহ্যিক ভূষণের সমরূপতা হয়ে দেখা দেয়, যা তার মনের সান্তনার কারণ হয়। তাকে আনন্দময় পরিবেশ থেকে দূরে রাখে।
অপর এক সূত্রে জানা যায়, শোকের সময় কালো পোশাক পরার রীতিটি রানি ভিক্টোরিয়ার রাজত্বকালে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি শোক করেছিলেন। তার মৃত স্বামী প্রিন্স অ্যালবার্টের মৃত্যুতে। পরবর্তীতে রানির এই উদাহরণটি অনুসরণ করে বৃটেনসহ সমগ্র ইউরোপ।
তারপর উনিশ শতকে ইংল্যান্ডের অভিজাত শ্রেণির নারীরা শোক প্রকাশের জন্য কালো পোশাকটিকেই বেছে নেন। ঐতিহ্য অনুযায়ি তারা ভারী কালো গাউন এবং সাথে কালো টুপি, যা কালো ওড়না দিয়ে ঘেরা এবং বিশেষ গহনা পড়তেন। সময়ের ব্যবধানে সংস্কৃতির পালাবদলে ভারতীয় উপমহাদেশেও কালো পোশাককে শোকের পোশাক হিসাবে গণ্য করা শুরু হয়। কালো রঙের শাড়ি, শার্ট, কামিজ, পাঞ্জাবি- এখন আমাদের শোকের পোশাক।
এদিকে শিল্পীদের মতে, সব রং মিশিয়ে তৈরি হয় কালো, সাদা তো ক্যানভাস। বলা হয় এ সাদা ও কালো একক রং নয়। দুটিই অনেক রঙের সমন্বয়। বিশেষ বিশেষ উপলক্ষ্য, বিশেষ আবেগ বা অনুভূতির প্রকাশ করা যায় সাদা-কালো দিয়ে। এ দুই রঙের পোশাকে ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটে। বয়সের জন্যও রঙের একটা ব্যাপার আছে। যেখানে এ দুটি রং সবচেয়ে বেশি মানায়। আবার ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে সাদা-কালোই সবচেয়ে বেশি মানানসই পোশাক। এ রকম আবহে অন্য উজ্জ্বল রংগুলো বাদ দেওয়াই উচিত বলে মনে করেন তারা।
এবার প্রশ্ন হলো, আমরা বাঙ্গালীরা কালো পোষাক গায়ে দিয়ে কোন অর্থে শোক প্রকাশ করি?
শোক প্রকাশ অর্থ হলো, আমার স্রষ্টার কাছে হারিয়ে ফেলা মৃত ব্যক্তির জন্যে মাগফেরাত কামনায় দোয়া করা। শ্রদ্ধা নিবেদন করে তার ভালোদিকগুলো তুলে ধরা৷ কিন্তু আমাদের দেশে কি হয়?
জানি সবার মনে দাগ কাটবে এমন প্রশ্ন রাখায়। কারো বিশ্বাসে, রীতিতে আঘাত দেয়ার মতো অভিযোগ থাকতে পারে। তবে অবুঝ হৃদয় প্রশ্ন করে ফেঁসে যাবেন যদি বিবেকবানদের কাছে উত্তর পেলে স্বার্থক হবো।
আমার কথা হলো, আমি মুসলিম। আমার ধর্মীয় রীতি মেনে আমি আমার শ্রদ্ধা প্রকাশ করবো। যিনি সনাতনী বা হিন্দু তিনি তার রীতিতে। একইভাবে বৌদ্ধ, খৃষ্টানসহ যার যার ধর্ম রীতি মেনে শ্রদ্ধা জানাবেন। সেটাই হওয়া আশা করেছিলাম। কিন্তু না আশায় নিরাশ হলাম। কোন কবি, সাহিত্যিক, পৌত্তলিক, ভিন দেশী রীতিকে কোন কারন ছাড়া অনুসরন করবেন? এর হেতু কি?
লেখক: সাংবাদিক