সেলিম খানসহ তিনজনের জরিমানার এক কোটি টাকা পরিশোধ
জনপ্রতিনিধি হিসাবে এখানেই তো নৈতিক স্খলংঘন ও শপথ ভঙ্গ!
বিশেষ প্রতিনিধিঃ
চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি অধিগ্রহণে ৩৫৯ কোটি টাকা জাল জালিয়াতির মাধ্যমে দুর্নীতির চেষ্টাকাণ্ডে সর্বোচ্চ আদালতের আদেশের কারাবন্দি চেয়ারম্যান সেলিম খানসহ তিনজনের জরিমানার এক কোটি টাকা পরিশোধ হয়েছে। এদিকে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় গত ১২ অক্টোবর ২০২২ থেকে কারাগারে থাকা চাঁদপুর সদর উপজেলার ১০নং লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সেলিম খান এখনো স্বপদে বহাল সর্বত্রই বিস্ময় এবং ক্ষোভ দিখা দিয়েছে।
স্থানীয় সরকার তথা ইউনিয়ন পরিষদ আইন- ২০০৯ ও এর পরেও সংশোধিত হয়ে আসা আইনে তিনি আরও আগেই বরখাস্ত হওয়ার কথা। কিন্তু সেলিম খান এখনো চেয়ারম্যান পদে বহাল থাকায় বিস্মিত স্থানীয় লোকজন। তারা মনে করছেন, প্রভাবশালী চক্র নানামুখী তদ্বিরের মাধ্যমে সেলিম খানকে এখনো চেয়ারম্যানের পদে বহাল রেখেছে।
এদিকে সেলিম খান স্বপদে থেকে কারাগারে অবস্থান করে চেয়ারম্যানের ক্ষমতা প্রয়োগকে পরিষদের স্বার্থের পরিপন্থি এবং প্রশাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে সমীচীন নয় বিধায় এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে মনে করেন বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ও সচেতন মহল।
চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চাবিপ্রবি) স্থাপনের জমি অধিগ্রহণে অস্বাভাবিক মূল্য দেখিয়ে জালিয়াতি এবং দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারের প্রায় ৩৬০ কোটি টাকা আত্মসাতের চেষ্টা করেছিল সেলিমসহ আরো কয়েকজন।
সরকারের প্রশাসন বিভাগের মাধ্যমে সেলিম খান উক্ত টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হাইকোর্টে দুটি রিট পিটিশন করে থাকে। উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন মামলা নং ১১৯৪৭/২১ এবং ১১৯৪৭/২১।
মামলা দুটির শুনানিতে ব্শ্বিবিদ্যালয়ের জন্য জমি অধিগ্রহণে সুকৌশলে সাড়ে ৬২ একর জমি মৌজা দরের চেয়ে প্রায় ২০ গুণ বেশি দেখানোর বিষয়টি ধরা পড়ে।
উক্ত মামলা দুটির দীর্ঘ শুনানি শেষে উচ্চ আদালত গত ৯ জুন ২০২২ চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চাবিপ্রবি) স্থাপনের জমি অধিগ্রহণে সরকারের ৩৬০ কোটি লোপাটের চেষ্টার জন্য রিট আবেদনকারীরা আদালতে জাল ডকুমেন্ট দেওয়ায় এবং আদালতের সময় নষ্ট করায় রিট আবেদনকারী মো. সেলিম খানসহ তিনজনকে এক কোটি টাকা জরিমানা করেছেন আদালত। এদের মধ্যে সেলিম খানকে ৫০ লাখ টাকা এবং অপর দুইজন মো: আব্দুল কাদির মিয়া ও জুয়েলকে ২৫ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। রিট আবেদনকারিদের দুই মাসের মধ্যে এই অর্থ পরিশোধ করতে নির্দেশ দেয় উচ্চ আদালত।
পাশাপাশি চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চাবিপ্রবি) স্থাপনের জমি অধিগ্রহণের জন্য জমির মূল্যহার পরীক্ষা কমিটি গঠন এবং ১৯৪ কোটি টাকার প্রক্কলনের বৈধতা নিয়ে রিট খারিজ রুল ডিসচার্জ করে রায় দেয় হাইকোর্ট। এদিকে সেলিম খান তার জরিমানার ৫০ লাখ টাকা গত ০৭/০৯/২০২২ তারিখে পে- অর্ডার নং ০৮৬১০৭৮ মূলে, মো: আবদুল কাদির মিয়া তার জরিমানার ২৫ লাখ টাকা গত ০৫/০৯/২০২২ তারিখে পে- অর্ডার নং ০৮৬১০৭৭ মূলে এবং জুয়েল তার জরিমানার ২৫ লাখ টাকা গত ২৪/১০/২০২২ তারিখে পে- অর্ডার নং ০৮৬১০৯৫ মূলে সোনালী ব্যাংক, চাঁদপুর পুরান বাজার শাখায় জমা প্রদান করেন। চাঁদপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে উক্ত জরিমানার এক কোটি টাকা গত ১৪/১১/২০২২ খ্রিঃ তারিখে সরকারের জরিমানা ও দন্ড এর ১৪৩১১০১ নং অর্থনৈতিক কোডে জমা দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে চাঁদপুর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ( রাজস্ব) মোছামৎ রাশেদা আক্তার জানান, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি অধিগ্রহণে সংক্রান্ত মামলায় উচ্চ আদালতের আদেশের আলোকে জরিমানার টাকা আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দেয়ার কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। এদিকে উচ্চ আদালতের রায়ে সেলিম খানের জরিমানার টাকা পরিশোধের ফলে নৈতিক স্খলন করণে তাকে চেয়ারম্যান পদ থেকে বহিস্কার বা অপসারণের বিষয়ে জানতে চাইলে চাঁদপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক ইমতিয়াজ হোসেন সাংবাদিককে জানান, স্থানীয় সরকার আইনে এবিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু উল্লেখ নেই। সেলিম খানের দুদকের মামলার বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা কাজ করছি। কিন্তু স্থানীয় সরকার বিষয়ক ও বেশ ক জন আইনজীবী বলছেন, আইনে হয়তো স্পষ্টতা তিনি বা তারা পাচ্ছেন না, কিন্তু একজন জনপ্রতিনিধি যখন শপথ নেন তখন ঐ শপথ বাক্যগুলোতে কী লেখা আছে? এ শপথ অনুযায়ীও সেলিম খান তার শপথ ভঙ্গ করেছেন! এদিকে উচ্চ আদালত কর্তৃক ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত এবং বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় কারাগারে থাকা বিতর্কিত ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সেলিম খানের বিরুদ্ধে এখনো কোন ব্যবস্থা নিতে পারেনি মন্ত্রণালয়। কিন্তু তার আগে গত ১৬ অক্টোবর চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক তার অপরাধের ফিরিস্তি তথা দুদকের মামলা সম্পর্কে জানিয়ে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে ঐ পরিষদের স্মারক উল্লেখ করে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে স্থানীয় মন্ত্রণালয়ে চিঠি প্রেরন করেন। জেলা প্রশাসকের চিঠি পেয়ে ২ নভেম্বর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় দুদকের মামলার সার্টিফাইড কপি চেয়ে জেলা প্রশাসককে চিঠি দেয় এবং পরবর্তী কর্ম প্রক্রিয়া শুরু করে। কিন্তু এরই মধ্যে দিন গড়িয়ে ২ সপ্তাহ পার হয়ে যায়। কিন্তু জেলা প্রশাসন তা দিতে পারিনি। অবশেষে আবারও গত রোববার স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয় চাঁদপুর জেলা প্রশাসককে মামলার সার্টিফাইড কপিটি পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, মামলার সার্টিফাইড কপি মন্ত্রণালয় না পাওয়ার কারণে জটিলতার সৃষ্টি, কালক্ষেপন এবং মন্ত্রণালয়েরও ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে । জরিমানা পরিশোধ, আদলতের চোখে ঘৃনীত একজন হিসাবে চিন্হিত, নদী থেকে বালুু উত্তলনে নিষেধাজ্ঞা ও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বিষয়ক রিট মামলায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করে মালাগুলোর পূর্নাঙ্গ রায় বহু আগেই প্রকাশ হওয়া, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি পদসহ দল থেকে আজীবনের জন্য তাকে বহিস্কার,সবশেষন দুদক মামলায় কারাগারে প্রায় দেড় মাস থেকেও সেলিম খান এখনো স্বপদেই বহাল রয়েছেন – এটি অনেকের কাছেই চরম বিস্ময়কর যেমনি, তেমনি স্থানীয় সর্বস্তরের কাছে আইনের শাসনের প্রতি সর্বস্তরের মানুষের অশ্রদ্ধার একটা মনোভাব জেগে উঠেছে। এছাড়া স্থানীয় প্রশাসনের এ ব্যাপারে একরকম কচ্ছপ গতি কর্মকান্ডে নানা গুন্জন ও প্রশ্নের অবতারণা হচ্ছে। জেলা আওয়ামী লীগ সহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও এ নিয়ে কঠোর সমালোচনা করছে। প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে,এর আগে সেলিম খানকে কারাগারে পাঠানোর বিষয়টি জানিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে গত ১৬ অক্টোবর চিঠি দেয় জেলা প্রশাসন। ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় গত ১২ অক্টোবর লক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সেলিম খানকে কারাগারে পাঠানোর বিষয়টি সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানান পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান।
চিঠিতে আরও বলা হয়, ‘সেলিম খানের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অপরাধে দুদক কর্তৃক দায়েরকৃত মামলায় অভিযোগপত্র আদালতে গৃহীত হওয়ায় এবং অপরাধ আদালত কর্তৃক আমলে নেয়ায় স্থানীয় সরকার আইনের (৩৪)১ ধারা অনুসারে উক্ত চেয়ারম্যান কর্তৃক ক্ষমতা প্রয়োগ পরিষদের স্বার্থের পরিপন্থি এবং প্রশাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে সমীচীন নয় বিধায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ’ বলে চাঁদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রতিবেদন দিয়েছেন জেলা প্রশাসক বরাবর। আর ওই প্রতিবেদনের আলোকে জেলা প্রশাসক মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন।